কানাডার অন্টারিও ও যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যে সক্রিয় দাবানলের ফলে সৃষ্ট ঘন ধোঁয়ায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বেশ কয়েকটি বড় শহরের বাসিন্দারা চরম বায়ুদূষণের মুখোমুখি হয়েছেন। নিউইয়র্ক, বোস্টন ও টরন্টোর নাগরিকদের দূষণের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে কঠোর শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কানাডিয়ান ইন্টারএজেন্সি ফরেস্ট ফায়ার সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সারা কানাডায় ৮৫৮টি দাবানল সক্রিয় রয়েছে, যার প্রায় ২০০টিই অন্টারিওতে। মিনেসোটার উত্তর সীমান্তে এখনও ১৭টি আগুন জ্বলছে এবং দমন কার্যক্রম জোরদার করতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে।
অন্টারিওতে আগুনগুলো সুপিরিয়র হ্রদের উত্তরে প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থিত, তবে অনেকগুলোই জাতীয় উদ্যান ও ফার্স্ট নেশন সম্প্রদায়ের মধ্যে বা কাছাকাছি। ছয়টি জনপদ থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ জারি করা হয়েছে এবং সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। গ্র্যান্ড কাউন্সিল প্রধান লিন্ডা ডেবাসিজ বুধবার এক বিবৃতিতে বলেন, উত্তর অন্টারিওর প্রত্যন্ত নামায়গুসিসাগাগুন ফার্স্ট নেশন সম্প্রদায় একটি আকস্মিক ও দ্রুতগামী দাবানলে বিধ্বস্ত হয়েছে, যাতে ঘরবাড়ি ও কমিউনিটি ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কানাডায় দাবানল খুবই সাধারণ ঘটনা হলেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে প্রাদুর্ভাবের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্কিন ন্যাশনাল ইন্টারএজেন্সি ফায়ার সেন্টার ও ন্যাচারাল রিসোর্সেস কানাডার পূর্বাভাস বলছে, জুনের শেষে উত্তর অন্টারিওজুড়ে টানা গরম আবহাওয়া ও স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাতই এর প্রধান কারণ।
এই তীব্র তাপপ্রবাহের পেছনে রয়েছে একটি 'হিট ডোম'— উচ্চচাপের একটি অঞ্চল যা আটকে পড়ে উষ্ণ বাতাস ও ধোঁয়াকে নিচে চেপে ধরে রাখে। চরম ও দীর্ঘস্থায়ী তাপ মাটি ও গাছপালা থেকে বেশি আর্দ্রতা শুষে নেয়, ফলে শুষ্ক উদ্ভিদ আগুনের জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। আবার এই উত্তপ্ত বাতাস অস্থিতিশীল হয়ে ঝড়ের সৃষ্টি করতে পারে, যা প্রবল বাতাসের মাধ্যমে আগুন ও ধোঁয়াকে দ্রুত ছড়িয়ে দেয়।
সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, বাতাস মূলত অন্টারিও থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ধোঁয়া বহন করে টরন্টো, নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্য পেরিয়ে বোস্টন পর্যন্ত নিয়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইকিউএয়ার বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ বায়ুমানের শহরের তালিকায় ডেট্রয়েট, টরন্টো ও মিনিয়াপোলিসকে শীর্ষে রেখেছে।
দাবানলের ধোঁয়ায় পিএম২.৫ ও নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের মতো অতি ক্ষুদ্র দূষণকারী কণার মিশ্রণ থাকে, যা মানবদেহের জন্য বিপজ্জনক। নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের স্বাস্থ্য কমিশনার জিম ম্যাকডোনাল্ড এক ভিডিও বার্তায় ব্যাখ্যা করেন, "এই কণাগুলো আমাদের দেহে প্রবেশ করে ফুসফুসের গভীরে, শ্বাসনালির শেষ প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছে প্রদাহ সৃষ্টি করে।" বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ধোঁয়া বিদ্যমান শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ, কিডনি ও চোখের সমস্যা বাড়িয়ে তুলতে পারে। জরুরি সেবাকর্মী এবং শিশু ও দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় ভোগা ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
সরকারগুলো বায়ুমানের স্তর অনুযায়ী সতর্কতা জারি করছে, যেমন অরেঞ্জ অ্যালার্টে কেএন৯৫ বা এন৯৫ মাস্ক পরার পরামর্শ দেওয়া হয় যা ৯৫% ক্ষুদ্র কণা ছাঁকতে সক্ষম। তবে অনলাইনে নকল মাস্ক বিক্রি হচ্ছে, তাই সরকারি সনদযুক্ত মাস্ক নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। অনেক শহর ইতোমধ্যে বায়ুমান জরুরি প্রটোকল সক্রিয় করেছে এবং স্থানীয় কেন্দ্রগুলোতে মাস্ক বিতরণ করছে।
বায়ুপ্রবাহের গতিপথ বলছে, ধোঁয়া দক্ষিণ দিকে ভার্জিনিয়া ও উত্তর ক্যারোলাইনার কিছু অংশে নেমে যাবে এবং শুক্রবার পর্যন্ত তাদের ধোঁয়ার সংস্পর্শ তীব্রতর হবে। দ্বিতীয় একটি ধোঁয়ার স্তর বৃহস্পতিবার পরে নিউইয়র্ক ও বোস্টনে আঘাত হানবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। নিউইয়র্কের পরিবেশ সংরক্ষণ বিভাগের কমিশনার আমান্ডা লেফটন সামাজিক মাধ্যমে বলেছেন, "নিউইয়র্কের বেশিরভাগ এলাকায় দৃশ্যমান ধোঁয়া দেখা যাবে। এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং বায়ুর মান আরও খারাপ হতে পারে।"
রবিবার নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল নির্ধারিত থাকায় উদ্বেগ রয়েছে, বিশেষত এটি একটি উন্মুক্ত স্থান হওয়ায় ধোঁয়া তখনও লেগে থাকতে পারে। সোমবার বাতাসের দিক পরিবর্তন মার্কিন শহরগুলোতে কিছুটা স্বস্তি বয়ে আনবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদি দাবানল পূর্বাভাস বলছে, জুলাই ও আগস্টজুড়ে কানাডার উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল, অন্টারিও ও কুইবেকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি দাবানলের ঝুঁকি অব্যাহত থাকবে। বোরিয়াল বনের প্রাকৃতিক অংশ হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দাবানলের তীব্রতা বেড়েছে। ২০২৩ সালের দাবানলে ১৫ মিলিয়ন হেক্টর এলাকা পুড়ে যায়, যা ইংল্যান্ডের চেয়েও বড়। ২০২৫ সালে পুড়েছে ৮.৩ মিলিয়ন হেক্টর। কানাডায় অর্ধেক দাবানলের সূত্রপাত বজ্রপাত থেকে, বাকি অর্ধেক মানবসৃষ্ট, তবে শুষ্ক মাটি ও উদ্ভিদ আগুন লাগার সম্ভাবনা বাড়ায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি তাপপ্রবাহকে ঘনঘন ও তীব্রতর করছে। শীতকালেও তাপমাত্রা বাড়ছে, যার ফলে বছরের শুরুতে মৃদু আবহাওয়ায় গাছপালা আগেভাগেই বেড়ে ওঠে, যা দাবানলের অতিরিক্ত জ্বালানি যোগায় এবং বরফের আচ্ছাদন কমিয়ে দেয়। বরফের সাদা পৃষ্ঠ সূর্যের বিকিরণ প্রতিফলিত করে শীতল প্রভাব ফেলে, তাই বরফ যত কমবে, তাপমাত্রা তত বাড়বে।




