গভীর রাতে বা সাপ্তাহিক ছুটির দিনে অফিস সংক্রান্ত ই-মেইল বা বার্তা পাঠানোকে কেন্দ্র করে পেশাদার জগতে বিতর্ক নতুন নয়। একদল মনে করেন, ই-মেইল যেহেতু ফোন কলের মতো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দাবি করে না, তাই নিজের সুবিধামতো সময়ে বার্তা পাঠিয়ে রাখা যায়। এই ধারণাকে কেউ কেউ ‘অ্যাসিঙ্ক অ্যালিবাই’ তথা ‘অসময়ের অজুহাত’ হিসেবে বর্ণনা করেন। মাইক্রোসফটের এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, বহু ব্যক্তি রাত ১০টার পর বা ভোর ৬টার দিকে ডাকবাক্স চেক করেন, কারণ এ সময়টি অনেকের কাছেই নিরিবিলি ও উৎপাদনশীল। কিন্তু এর প্রভাব যে কেবল প্রেরকের মধ্যেই সীমিত থাকে না, সেটিই প্রকৃত সমস্যার কারণ। যিনি রাতে চিঠি পাঠান, তিনি নিজের কাজ সেরে নিশ্চিন্ত থাকলেও যিনি সেটি গ্রহণ করছেন, তাঁর মধ্যে স্বভাবতই এক ধরনের তাড়া তৈরি হতে পারে। গবেষকদের ভাষায় এটি ‘ই-মেইল আর্জেন্সি বায়াস’, যেখানে প্রাপকের মনে হয় উত্তর এখনই দেওয়া প্রয়োজন। আবার কোনো ডাক না এলেও ‘এই তো একটি মেসেজ এল’, এমন ভাবনা থেকে উদ্ভূত মানসিক উদ্বেগকে বলা হয় ‘অ্যান্টিসিপেটরি স্ট্রেস’। বিষয়টি একজন শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতার মতোই—ছুটির দিনেও শিক্ষকের ফোন আসার আতঙ্ক যেন মনে বাসা বাঁধে। এই পরিস্থিতিতে রাতের ই-মেইল পুরোপুরি বর্জনীয় কিনা তা অনেক পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। একজন সাধারণ সহকর্মী বা সহপাঠীকে অসময়ে বার্তা দিলে তা বড় কোনো প্রতিক্রিয়া নাও সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু সংস্থার প্রধান বা ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তা যখন রাতে ই-মেইল করেন, তখন তা নিছক তথ্য আদান-প্রদান নয়, বরং একটি অলিখিত প্রত্যাশা বা চাপের আবহ তৈরি করে। দিনের বাইরে কেবল একটি জিজ্ঞাসা রাখা হলেও, কাউকে নতুন দায়িত্ব অর্পণ বা তিরস্কার জানানো অত্যন্ত অনুচিত। এমনকি ‘সকালে একটু কথা আছে’ টাইপের রহস্যজনক বাক্যও একজনের সম্পূর্ণ রাতের বিশ্রাম কেড়ে নিতে পারে। সত্যিই জরুরি অবস্থা হলে ই-মেইলের পরিবর্তে ফোন করা বাঞ্ছনীয়। সমস্যার সমাধানে সহজ কিছু ডিজিটাল পন্থা বিদ্যমান। অনেক ই-মেইল প্ল্যাটফর্মে একটি শিডিউল বৈশিষ্ট্য আছে, যা রাতে লিখে রেখে পরবর্তী কার্যদিবসে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রেরণ করা যায়। যদি অনিবার্যভাবে রাতেই পাঠাতে হয়, তবে বার্তার শেষে উল্লেখ করে দেওয়া শ্রেয় যে ‘অমুক দিনের আগে উত্তরের প্রয়োজন নেই’। এতে প্রাপক মানসিক চাপমুক্ত থেকে ঘুমাতে পারেন। একই সাথে, গ্রহীতাও নিজের জন্য একটি সীমা নির্ধারণ করতে পারেন, যেমন রাত আটটার পর কোনো ডাকবুকু চেক না করার নীতি। কিছু দেশ যেমন অস্ট্রেলিয়া এ বিষয়ে ইতোমধ্যে আইন প্রণয়ন করেছে, যার আওতায় কর্মীরা কাজের সময়ের বাইরে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ এড়াতে পারবেন। সুতরাং, অসময়ে বার্তা প্রেরণা বুদ্ধিমানের কাজ নয়, বরং সামান্য অ সাবধানতায় অন্যের গভীর রাতের শান্তি বিপর্যস্ত হয়ে যেতে পারে। তাই রাতে বা ছুটির দিনে মেসেজ পাঠানোর আগে বিবেচনা করাই উচিত যে, নিজের এই ছোট কাজটি অন্যের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে কি না।