অনলাইন চাকরির বাজারে এখন প্রচণ্ড প্রতিযোগিতা চলছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) এবং পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, বর্তমানে অনলাইন জব পোর্টালে প্রকাশিত একটি পদের বিপরীতে গড়ে ২৮৭ জন চাকরিপ্রার্থী আবেদন করছেন। করোনা মহামারির আগের পাঁচ বছরে এই সংখ্যা ছিল ১৭৩ জন। অর্থাৎ, করোনা-পরবর্তী সময়ে চাকরি পাওয়া অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে।

বৃহস্পতিবার বিআইডিএস আয়োজিত 'কঠিন সময়ে শ্রমবাজার এবং সামগ্রিক ধাক্কা: বৃহত্তম অনলাইন চাকরির পোর্টালের তথ্যপ্রমাণ' শীর্ষক সেমিনারে এই গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিআইডিএসের মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক, এবং প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি (জোনায়েদ সাকি)।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, করোনার লকডাউনের সময় শ্রমবাজার সবচেয়ে বেশি স্থবির হয়ে পড়েছিল এবং স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সাড়ে ৯ মাস সময় লেগেছে। তবে মহামারির প্রকোপ কমে যাওয়ার পর চাকরি পাওয়ার প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়েছে। বর্তমানে এই প্রতিযোগিতা করোনা-পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় প্রায় ৬৬ শতাংশ বেশি, যা কর্মসংস্থানে দীর্ঘমেয়াদি চাপের ইঙ্গিত দেয়।

গবেষণা প্রতিবেদনের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক অতনু রব্বানী। তিনি জানান, অনলাইন জব পোর্টালের মাধ্যমে দেশের মোট চাকরির আড়াই থেকে তিন শতাংশ হয়ে থাকে। এই গবেষণার জন্য ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দশ বছর ছয় মাসের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। করোনা মহামারির লকডাউনে প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত নিয়োগ বন্ধ করে দেওয়ায় চাকরির বিজ্ঞপ্তি ৭০ শতাংশ কমে গিয়েছিল। একই সময়ে চাকরির আবেদনও ৫৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল। তবে চাকরির সুযোগের তুলনায় চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা কম হারে কমেছে, যার ফলে প্রতি পদের বিপরীতে আবেদনকারীর সংখ্যা ১৭৩ থেকে বেড়ে ২৮৭ জনে দাঁড়িয়েছে।

অতনু রব্বানী আরও বলেন, দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৮৫ থেকে ৮৯ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে, এবং বাকি অংশ আনুষ্ঠানিক খাতে। আনুষ্ঠানিক খাতের মধ্যে অনলাইন জব পোর্টালের মাধ্যমে চাকরি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে মাত্র আড়াই শতাংশ। এই অংশ কম হলেও, জব পোর্টালের তথ্য শ্রমবাজারে আকস্মিক পরিবর্তনের দ্রুত সংকেত দিতে পারে, যা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজে লাগানো সম্ভব।

গবেষণায় দেখা গেছে, গত দশ বছরে গড়ে প্রতি সপ্তাহে ১ হাজার ১৫৪টি চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে এবং সপ্তাহে গড়ে ৩ হাজার ৬৪৬ পদের বিপরীতে আবেদনের সুযোগ ছিল। এই পদের বিপরীতে সপ্তাহে গড়ে ৬ লাখ ৯৬ হাজার ৯৫৫ জন চাকরিপ্রার্থী আবেদন করেছেন। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিগুলোর মধ্যে ৫৪ শতাংশের ক্ষেত্রে লিঙ্গ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয় না। অধিকাংশ পদই কর্মে প্রবেশের শুরুর দিকের, তবে উচ্চপর্যায়ের পদে সরাসরি নিয়োগ বেশি হচ্ছে।

অতনু রব্বানী আরও উল্লেখ করেন, গত দশ বছরে মুদ্রানীতি দিয়ে সরকার শ্রমবাজারে তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি। শুধু ঋণসুবিধা দিয়ে কর্মসংস্থান বাড়ানোর চেষ্টা যথেষ্ট নয়। তবে সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি কিছুটা সুযোগ বাড়াতে পারে। তিনি বলেন, বর্তমানে বিদ্যমান পদের কর্মে নিয়োগ কম হচ্ছে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হারে বাড়ছে। ফলে বেকারত্ব বেশি হওয়ায় প্রতিযোগিতা অনেক বেড়েছে এবং চাকরি পেতে অনেক বেশি সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

সেমিনারে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, 'ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছি। পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এতে কর্মীরা দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন।' তিনি আরও বলেন, সরকার বিনিয়োগনির্ভর উৎপাদনশীল অর্থনীতি গড়তে চায়, যাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এ জন্য বিনিয়োগ বৈচিত্র্যকরণের চেষ্টা চলছে এবং কমপক্ষে দশটি ক্ষেত্রে নতুন বিনিয়োগ আনার মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়ানোর কাজ চলছে।

বিআইডিএসের মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক বলেন, করোনার সময় শ্রমবাজার বড় হোঁচট খেয়েছে এবং ইউক্রেন যুদ্ধসহ বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাবও পড়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টেও সাময়িকভাবে কর্মসংস্থান খারাপ অবস্থায় ছিল। পরে ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়। তবে শ্রমবাজার করোনা-পরবর্তী নানা কারণে বেশ কঠিন অবস্থার মধ্যে রয়েছে।