প্রযুক্তি খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যয় নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে, কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় টোকেন ব্যবহারের ভিত্তিতে কর্মীদের র্যাঙ্কিং করার প্রবণতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। কগনিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) স্কট উ-এর মতে, কোম্পানিগুলো টোকেনম্যাক্সিং নামে পরিচিত এই ট্রেন্ডে বাড়াবাড়ি করছে। সম্প্রতি ডেভিড সেনরার পডকাস্টে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, টোকেন বাজেটের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে, কিন্তু প্রকৃত মূল্য সৃষ্টি হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। তার ভাষ্য, এটা দিকনির্দেশনাগতভাবে ঠিক হলেও কিছু ক্ষেত্রে মানুষ সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, কেউ কেউ প্রকৌশলীদের টোকেন খরচের ভিত্তিতে র্যাঙ্ক করে, অথচ তাদের প্রকৃত উৎপাদনশীলতার দিকে নজর দেওয়া উচিত। কগনিশন নিজের সাফল্য মাপে ইঞ্জিনিয়ারিং সক্ষমতা কতটা বাড়াতে পেরেছে তার ভিত্তিতে, যা প্রতিষ্ঠানটির তৈরি ডেভিন নামের প্রথম এআই কোডিং এজেন্টের মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছে। গোল্ডম্যান শ্যাকসের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও মার্সিডিজ-বেঞ্জ এবং রিভিয়ানের মতো গাড়ি প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো ডেভিন ব্যবহার করছে গবেষণা ও উন্নয়নের কাজে।

স্কট উ-এর এই মন্তব্যের প্রেক্ষাপটে রয়েছে মেটা ও অ্যামাজনের মতো প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের টোকেন ব্যবহার উৎসাহিত করতে তৈরি করা অভ্যন্তরীণ লিডারবোর্ডের ঘটনা। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ব্যবস্থা উদ্ভাবন বাড়ানোর পরিবর্তে কর্মীরা অপ্রয়োজনীয় কাজে বট ব্যবহার করে তাদের র্যাঙ্কিং বাড়ানোর চেষ্টা করায় তা পরিত্যক্ত হয়। অ্যামাজনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেভ ট্রেডওয়েল কর্মীদের উদ্দেশে বলেন, শুধু এআই ব্যবহারের জন্যই এআই ব্যবহার করবেন না। টোকেনম্যাক্সিংয়ের ফলে কোম্পানিগুলোর আর্থিক ক্ষতিও হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, উবার ২০২৬ সালের পুরো এআই বাজেট মাত্র চার মাসে শেষ করে ফেলে এবং গত মাসে কর্মীদের জন্য মাসিক টোকেন ব্যয়ের সীমা ১,৫০০ ডলার নির্ধারণ করে। প্রযুক্তির উন্নতির সাথে টোকেনের দাম ২০২৩ সালের তুলনায় ৯০ শতাংশ কমলেও কোম্পানিগুলোর এআই ব্যয় বেড়েছে, কারণ সস্তা টোকেন বেশি ব্যবহার করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

স্কট উ সতর্ক করে বলেন, জিপিইউ-এর মতো সরঞ্জাম ব্যয়বহুল হলেও যদি প্রকৌশলীরা তিনগুণ বেশি কাজ করতে পারে, তবে তা সার্থক। তবে সঠিক উপায়ে তা করতে হবে। বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের (বিসিজি) ২০২৬ সালের বৈশ্বিক এআই অ্যাট ওয়ার্ক রিপোর্টে এই ভারসাম্যহীন ব্যয়-আউটপুট অনুপাতকে এআই উৎপাদনশীলতা না বাড়ানোর একটি প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রায় ১২ হাজার ফ্রন্টলাইন কর্মীর ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, নিয়মিত এআই ব্যবহারকারী ৪২ শতাংশ কর্মী সপ্তাহে আট ঘণ্টা সময় বাঁচালেও ৬৬ শতাংশই সেই সাশ্রয়ী সময় কীভাবে কাজে লাগাবেন সে বিষয়ে নির্দেশনা পাননি। অর্ধেকের বেশি উত্তরদাতা বলেন, তারা সেই সময় অন্য কৌশলগত প্রকল্পে ব্যয় করেননি।

বিসিজির পিপল অ্যান্ড অর্গানাইজেশন প্র্যাকটিসের বৈশ্বিক নেতা ডেভিড মার্টিন ফরচুনকে বলেন, এআই নিয়ে কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা সংক্রান্ত যে প্যারাডক্স দেখা যাচ্ছে, তা মূলত নেতৃত্বের স্পষ্ট লক্ষ্য ও যোগাযোগের অভাবের কারণে সৃষ্ট মানবসৃষ্ট সমস্যা। তার মতে, শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা এআই নিয়ে কৌশল ও দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করতে ব্যর্থ হচ্ছেন, যা কর্মীদের মধ্যে ভীতি বাড়াচ্ছে এবং উদ্দেশ্য বোঝা কঠিন করে তুলছে। মার্টিন স্কট উ-এর দর্শনের সাথে একমত হয়ে বলেন, কোম্পানিগুলোকে এআইকে যেকোনো নতুন কর্মক্ষেত্রের হাতিয়ারের মতো বিবেচনা করে এর সম্ভাব্য সুবিধা যাচাই করা উচিত, এটিকে উৎপাদনশীলতার সর্বগ্রাসী সমাধান হিসেবে না দেখে। তিনি আরও বলেন, অনেক কোম্পানি সব কর্মীকে একইভাবে এআই সুবিধা দিয়েছে, এখন তাদের ভাবতে হবে কার কার কী অ্যাক্সেস থাকবে এবং ব্যবসায়িক যুক্তি কী। শেষ পর্যন্ত, গত ১০০ বছরে যেমন অন্য যেকোনো বিষয়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য দায়বদ্ধ রাখা হয়, তেমনি এআইয়ের ক্ষেত্রেও তা করা উচিত।