বাণিজ্যিক খরচ কমানোর জন্য ইউরোপ তার সরবরাহ শৃঙ্খলকে সর্বোচ্চ অপ্টিমাইজ করেছিল, কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা তাকে স্থিতিস্থাপকতার মূল্য দিতে বাধ্য করছে। ব্যবসা ও রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে উপলব্ধি বাড়ছে যে মহাদেশটির কিছু গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ চেইন কতটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবে এই উপলব্ধিকে কার্যকর পদক্ষেপে রূপান্তর করাটাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ। সরকারি এবং শিল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনায় সবার কাছেই বিষয়টি স্পষ্ট। কেউই এ নিয়ে দ্বিমত পোষণ করেন না। প্রশ্ন হলো, এই বোঝাপড়াকে আমরা কীভাবে বাস্তবায়নে নিয়ে যেতে পারি। বর্তমানে উৎসাহব্যঞ্জক পরিস্থিতি থাকলেও স্বস্তি নেই বলে মন্তব্য সংশ্লিষ্ট এক বিশেষজ্ঞের।
আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, ইউরোপে ব্যবহৃত ওষুধের প্রায় ৭০ শতাংশই জেনেরিক এবং বায়োসিমিলার জাতীয়, যার মূল্য মোট ওষুধ ব্যয়ের মাত্র ১০ থেকে ২০ শতাংশ। জেনেরিক কোম্পানি না থাকলে ইউরোপে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়বে। কিন্তু এই ওষুধগুলোর অধিকাংশ—বিশেষ করে নন-বায়োলজিক কমপ্লেক্স ওষুধ—ইউরোপে তৈরি হয় না। প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক উপাদান চীন বা ভারত থেকে আমদানি করতে হয়। ইউরোপের অভ্যন্তরে প্রায় কোনো উৎপাদনই নেই, কারণ মূল্য নির্ধারকরা খরচ কমানোর প্রতিযোগিতায় দামকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। যদি ৭০ শতাংশ ওষুধের দাম মোট ব্যয়ের ২০ শতাংশ হয়, তাহলে বোঝাই যায় বাজার কোথায় এগোচ্ছে। খরচ কমানোর পেছনে ছুটতে গিয়ে মানুষ স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তার মূল্য ভুলে গেছে।
কোভিড-১৯ মহামারি এই দুর্বলতা উন্মোচন করেছে, পাশাপাশি দেখিয়েছে কী সম্ভব। মহামারির পর সরবরাহের সার্বভৌমত্ব শীর্ষ অগ্রাধিকারে পরিণত হয়। সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা প্রায়শই কেবল তখনই সামনে আসে যখন তা পরীক্ষার মুখে পড়ে। বিদ্রূপের বিষয়, ইতালি থেকে অস্ট্রিয়ায় পণ্য সরাতে প্রায়ই ভারত থেকে ইউরোপে আনার চেয়ে বেশি সমস্যা হয়। কারণ প্রতিটি সরকার নিজস্ব পেটেন্ট ও আন্তর্জাতিক স্বার্থ রক্ষায় সক্রিয় থাকে, ইউরোপীয় সরবরাহ কাঠামোর সম্মিলিত স্বার্থে কাজ করে না। তবে মহামারির সময় জাতীয় স্বার্থ আঞ্চলিক স্বার্থের ওপর প্রাধান্য পেতে দেখা গেছে। সংকটকালে একটি উপায় বের করা সম্ভব হয়েছিল, যা প্রমাণ করে যে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পদ্ধতি বিদ্যমান। হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন তৈরির উদাহরণ টানা যায়—মহামারির সময় তিন সপ্তাহ ধরে এটিকে কোভিড-১৯-এর নিরাময় বলে মনে করা হয়েছিল (বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটি সুপারিশ করে না)। প্রায় ৫০ থেকে ১০০ মিলিয়ন প্যাক উৎপাদন করে খুব অল্প সময়ের মধ্যে ৩৫ থেকে ৪০টি বাজারে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল, কারণ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো তাদের স্বাভাবিক প্রয়োজনীয়তা শিথিল করেছিল। ইচ্ছা করলে সমস্যার সমাধান বের করা যায়। আশা করা যায়, ইইউ ক্রিটিকাল মেডিসিনস অ্যাক্টের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রক পরিবেশ আবারও পরিবর্তিত হয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্য এবং মধ্য-পূর্ব ইউরোপ—বিশেষ করে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থা ইউরোপকে নিজের ভূমিকা পুনর্মূল্যায়নে বাধ্য করেছে, যা ইতিবাচক বলে মনে করছেন অনেকে। তবে ইউরোপের সব সরবরাহ শৃঙ্খল পুনরায় দেশে ফিরিয়ে আনা একটি বড় আকাঙ্ক্ষা হলেও তা সম্পূর্ণ অবাস্তব। এটি অর্থনীতির প্রশ্ন। যদি অর্থনৈতিক পরিবেশ এমন হয় যা পুরস্কৃত করে, তবেই মানুষ ইউরোপে অবকাঠামো তৈরি করবে এবং কাঁচামাল উৎপাদন করবে। তা না হলে কেউ কেন করবে? একটি কোম্পানির বোর্ড যুক্তিসঙ্গত রিটার্ন দেখাতে না পারলে সেই মূলধন বিনিয়োগের অনুমতি দেবে না এবং এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া নির্বাহীর চাকরি বেশি দিন টিকবে না।
আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে অনেক শিল্প মূল্যস্ফীতিমূলক ধাক্কার মুখোমুখি হবে। উপকরণ, জ্বালানি ও সুদের হার—সবকিছুর খরচ বাড়ছে। এর অর্থ ব্যবসা পরিচালনার খরচ বাড়ছে। বাস্তবতা হলো, এই খরচ গ্রাহকের কাঁধে চাপাতে হবে, ফলে সব ওষুধের দাম বাড়বে। ইউরোপ আইন প্রণয়নে দুর্দান্ত, কিন্তু সব সময় সব প্রভাব বিবেচনা করে না। সরকারের সঙ্গে কাজ করে সরবরাহ শৃঙ্খল রক্ষা ও সমর্থনের সমাধান খুঁজে বের করার দায়িত্ব সবার রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী মূলধন বিনিয়োগের জন্য অর্থনৈতিক প্রণোদনা না থাকলে গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের সরবরাহ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে। ইউরোপের জনসংখ্যা বয়স্ক হচ্ছে, অসুস্থ হচ্ছে এবং পছন্দ হোক বা না হোক, দরিদ্র হচ্ছে। একটি সুস্থ সমাজ ছাড়া বাকি সবকিছু ভেঙে পড়ে। পেনিসিলিন যে কোনো ওষুধের চেয়ে বেশি প্রাণ বাঁচিয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এটি ৮০ বছর আগে যেসব সংক্রমণ মারাত্মক হতো, সেগুলোকে চিকিৎসাযোগ্য করে তুলেছে। এর ফলে অধিকাংশ অপারেশন এখন নিরাপদে করা যায়, সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক কম। আমরা এসবকে মেনে নিয়েছি, অথচ আজকের বাজারে একটি মার্স বার বা চিউইং গামের প্যাকেটের চেয়েও কম দামে এই পণ্য বিক্রি হয়। ওষুধ উৎপাদনের খরচ বোঝা গেলেও প্রায়শই এর মূল্য ভুলে যাই। আশা করা যায়, এই ধারণা ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে।
ফরচুন ডটকমের মতামত কলামে প্রকাশিত মতামতগুলি কেবল তাদের লেখকদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং অগত্যা ফরচুনের মতামত ও বিশ্বাস প্রতিফলিত করে না।



