প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে মেক্সিকোর ইউকাটান উপদ্বীপে একটি দানবীয় গ্রহাণুর আঘাতে পৃথিবী থেকে চিরতরে মুছে গিয়েছিল ডাইনোসরদের অস্তিত্ব। দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা বিতর্ক করে আসছিলেন যে এই বিলুপ্তি ধীরে ধীরে অনাহারে নাকি তৎক্ষণাৎ ঘটেছিল। জার্নাল অব জিওফিজিক্যাল রিসার্চ: বায়োজিওসায়েন্সেস-এ প্রকাশিত এক নতুন গবেষণা বলছে, দ্বিতীয় সম্ভাবনাটিই সঠিক—অর্থাৎ ডাইনোসরদের মৃত্যু খুব সম্ভবত এক নিমিষেই ঘটেছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের পারডু ইউনিভার্সিটির গ্রহবিজ্ঞানী ব্র্যানডন জনসনের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রহাণুটির গতি ছিল সেকেন্ডে প্রায় ১২ মাইল। এর আঘাতের শক্তি ছিল ১০০ টেরাটন টিএনটির সমান, যা হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে ফেলা পারমাণবিক বোমার চেয়েও ১০০ কোটি গুণ বেশি শক্তিশালী। এই প্রচণ্ড আঘাতে পৃথিবীতে তৈরি হয়েছিল ৬২ মাইল চওড়া ও ১৯ মাইল গভীর একটি বিশাল গর্ত। একইসঙ্গে ২ মাইল উঁচু সুনামি ও ঘণ্টায় ৬২০ মাইল বেগে প্রলয়ংকরী ঝড় আছড়ে পড়েছিল চারদিকে।
গ্রহাণুর আঘাতে প্রায় ২৫ লাখ কোটি মেট্রিক টন ধ্বংসাবশেষ বায়ুমণ্ডলে ছিটকে ওঠে। এর মধ্যে বিপুল পরিমাণ পাথর প্রচণ্ড তাপে বাষ্পে পরিণত হয়ে বায়ুমণ্ডলের অনেক ওপরে চলে যায়। ২০২৩ সালে উত্তর আমেরিকায় বিজ্ঞানীরা একধরনের মিহি ধুলোর স্তর খুঁজে পান, যা মূলত ওই পাথরের বাষ্প থেকে তৈরি হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। ব্র্যানডন জনসন ও তাঁর দল এই পাথরের বাষ্পের ওপর একটি কম্পিউটার সিমুলেশন তৈরি করেন। সেখান থেকে বেরিয়ে আসে এক ভয়ংকর তথ্য।
আকাশে ছড়িয়ে পড়া পাথরের বাষ্প একধরনের পুরু কম্বলের মতো কাজ করেছিল, যা পৃথিবীর পৃষ্ঠের তাপমাত্রা সাধারণ ধ্বংসাবশেষের চেয়ে অন্তত সাড়ে তিন গুণ বেশি বাড়িয়ে দিয়েছিল। এই প্রচণ্ড তাপ মুহূর্তের মধ্যে বিপুলসংখ্যক প্রাণীকে ঝলসে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। এমনকি এর ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে স্বতঃস্ফূর্তভাবে দাবানল জ্বলে ওঠে। গবেষকদের মতে, গ্রহাণু আঘাত হানার প্রথম এক বা দুই ঘণ্টার মধ্যেই হয়তো পৃথিবীর প্রায় সব প্রাণীর মৃত্যু হয়েছিল।
মজার ব্যাপার হলো, এই নতুন গবেষণা ডাইনোসরদের ধীরে ধীরে অনাহারে মারা যাওয়ার পুরোনো তত্ত্বকে পুরোপুরি বাতিল করছে না। ব্র্যানডন জনসনের মতে, ঘটনাটি কিছুটা থার্মোফ্লাস্কের মতো কাজ করেছিল—অর্থাৎ পৃথিবী প্রথমে দীর্ঘক্ষণ প্রচণ্ড গরম ও পরে কনকনে ঠান্ডা অবস্থায় ছিল। প্রথমে আকাশ থেকে পড়া জ্বলন্ত পাথর ও বাষ্পের কারণে তৈরি হওয়া প্রচণ্ড তাপে মুহূর্তের মধ্যে প্রাণীরা মারা যায়। এরপর সেই আগুন নিভে গেলে আকাশে ভাসমান ধুলোর মেঘ বছরের পর বছর বা দশকের পর দশক সূর্যের আলোকে আটকে রাখে, ফলে পৃথিবীতে নেমে আসে এক হিমশীতল অন্ধকার।
তবে এই তত্ত্ব পুরোপুরি নিশ্চিত করতে আরও তথ্যের প্রয়োজন। কারণ, ডাইনোসর আমলের দাবানলের বেশির ভাগ প্রমাণ এখনো শুধু উত্তর আমেরিকাতেই পাওয়া গেছে। গ্রহাণু পড়ার কেন্দ্রবিন্দু থেকে অনেক দূরের এলাকাগুলোতে দাবানলের বড় কোনো প্রমাণ এখনো মেলেনি। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের জীবাশ্মবিদ আলেসান্দ্রো চিয়ারেঞ্জা মনে করেন, ভবিষ্যতে হয়তো আমরা পুরো বিশ্বজুড়ে দাবানল ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণও পেয়ে যাব, যা এখনো আমাদের চোখের আড়ালেই রয়েছে। তবে মৃত্যুর ধরন যেমনই হোক না কেন, ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে গ্রহাণুর আঘাত যে ডাইনোসরদের চূড়ান্ত সমাপ্তি ডেকে এনেছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
সূত্র: পপুলার সায়েন্স




