টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের জেরে চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা এখন প্লাবিত। প্রাকৃতিক এই দুর্যোগের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর পোস্ট ছড়িয়ে পড়ছে, যার সত্যতা যাচাইয়ে নেমেছে সংশ্লিষ্ট মহল। অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, ব্যাপকভাবে ভাইরাল হওয়া বহু ছবি ও ভিডিও পুরোনো ঘটনা বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি।

সাম্প্রতিক সময়ে ফেসবুকে একটি ভিডিও ব্যাপক প্রচার পেয়েছে যেখানে এক নারীকে গাছের ডালে শুয়ে থাকতে দেখা যায়। দাবি করা হয়, চট্টগ্রামের বন্যায় গর্ভস্থ সন্তান নিয়ে নিজের প্রাণ বাঁচাতেই তিনি এভাবে আশ্রয় নিয়েছেন। তবে তদন্তে বেরিয়ে আসে, একই ভিডিও ২০২৪ সালের আগস্ট মাস থেকে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর এলাকার দাবিতে ছড়ানো হচ্ছিল। ‘জয়নাল অঞ্জনা ভ্লগস’ নামের একটি ফেসবুক পেজে মূল ভিডিওটি পাওয়া গেছে, যেখানে স্থান উল্লেখ রয়েছে। ওই নারী নিজেও ফেসবুকে জানিয়েছেন, এটি টাঙ্গুয়ার হাওরের ঘটনা। চট্টগ্রামের চলমান বন্যার সঙ্গে ভিডিওটির কোনো সম্পর্ক নেই; কোনো নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমেও এ ধরনের খবর পাওয়া যায়নি।

এর বাইরে আরেকটি ভিডিওতে বন্যার পানিতে লাশ ভাসিয়ে নেওয়ার দৃশ্য দেখান হয়, যা চট্টগ্রামের বর্তমান বন্যার দাবি করে ছড়ানো হয়। তবে বিস্তারিত যাচাইয়ে ‘বিটিক বাজ’ নামের একটি ফেসবুক পেজে ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট প্রকাশিত ভিডিওর সঙ্গে মিল পাওয়া গেছে। গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, এটি ২০২৪ সালে ফেনীর ভয়াবহ বন্যার সময় ধারণ করা ফুটেজ। ওই বছর ভারী বর্ষণে ফেনী, নোয়াখালীসহ ১১টি জেলা প্লাবিত হয়েছিল এবং সে সময় ভাসমান মরদেহের একাধিক ভিডিও প্রকাশিত হয়েছিল। বর্তমান বন্যায় সাতকানিয়া উপজেলায় একজন ব্যক্তির মৃতদেহ ভেলায় করে দাফনের ঘটনা ঘটলেও, সেই দৃশ্যের সঙ্গেও ভাইরাল ভিডিওটির মিল নেই।

‘জলাবদ্ধতার মাঝে সন্তানকে বাবার আগলে রাখার চেষ্টা’—শিরোনামে আরেকটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। গলাসমান পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে একজন ব্যক্তি দুটি শিশুকে মাথার ওপর তুলে ধরে আছেন। আবেগঘন সংগীত ও পরিবেশ দিয়ে ভিডিওটিকে বর্তমান বন্যার প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু ‘সার্ভেয়ার রুবেল খান’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ২০২৪ সালের ২৪ আগস্ট একই ভিডিও পাওয়া গেছে। একই অ্যাকাউন্টে শিশুদের নিয়ে আরও ফুটেজ সংরক্ষিত আছে। স্পষ্টতই এটি চট্টগ্রামের বর্তমান বন্যার দৃশ্য নয়, বরং পুরোনো ভিডিওকে নতুন সময়ের প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করা হয়েছে।

পাশাপাশি বন্যার ভয়াবহতা বোঝাতে কয়েকটি স্থিরচিত্রও ছড়িয়ে পড়েছে। একটির ক্যাপশনে লেখা ‘আস্ত একটা শহর পানির নিচে, Keep Chittagong in your prayer’। অন্যটিতে ‘আল্লাহ চট্টগ্রামকে হেফাজত করুন’। বিপরীত চিত্র অনুসন্ধান ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে খোঁজ করলে এই ছবির কোনো বাস্তব ভিত্তি মেলেনি। একাধিক এআই শনাক্তকারী টুলে পরীক্ষা করে দেখা যায় ছবিগুলো ডিজিটালি সম্পাদিত। গুগলের সিন্থ আইডি (SynthID) প্রযুক্তি বিশ্লেষণে ছবির নির্দিষ্ট অংশে গুগল এআইয়ের ডিজিটাল ওয়াটারমার্ক শনাক্ত হয়েছে, যা কৃত্রিমভাবে তৈরির দৃঢ় প্রমাণ দেয়।

সামগ্রিক বিচারে চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো বেশিরভাগ আবেগঘন দাবিই ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিমূলক। তথ্যগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের পর বিশেষজ্ঞরা এসব পোস্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন।