নতুন প্রযুক্তি, প্রতিযোগিতা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অগ্রগতির সমন্বয়ে আকাশে ওড়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠছে বৈদ্যুতিক এয়ার ট্যাক্সি। চিরাচরিত পদ্ধতিতে নিউ ইয়র্কের মিডটাউন ম্যানহাটন থেকে জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছাতে যানজটের কারণে ৪৫ মিনিট থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সময় ব্যয় হয় এবং খরচ পড়ে প্রায় ১০০ ডলার। কিন্তু জবি এভিয়েশনের নির্বাহী চেয়ারম্যান পল শিয়ারার মতে, শিগগিরই এক হাজার ফুট ওপরে থেকে মনোরম দৃশ্য উপভোগ করে মাত্র ১০ মিনিটেরও কম সময়ে এই যাত্রা সম্পন্ন করা যাবে এবং ভবিষ্যতে খরচও সমতুল্য হবে।
একেবারে ভিন্ন এক পরিবহন মাধ্যমের সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে যাচ্ছে ইভিটআপ বা ‘ইলেকট্রিক ভার্টিক্যাল টেক-অফ অ্যান্ড ল্যান্ডিং’ বিমান। এগুলো হেলিকপ্টার, বিমান ও ড্রোনের বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়। জবির বিমানে ছয়টি বৈদ্যুতিক রোটর রয়েছে, যা প্রথমে একে উলম্ব ভাবে উপরে তোলে এবং পরে কাত হয়ে সামনের দিকে ধাবিত করে। এর শব্দ প্রচলিত হেলিকপ্টারের চেয়ে অনেক কম। এটি একজন পাইলটসহ চারজন আরোহীকে ক্রাইসলার ভবনের সমান এক হাজার ফুট উচ্চতায় ১০০ মাইল পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে। শিয়াররা ব্যাখ্যা করে বলেছেন, যেখানে শব্দ ও নিরাপত্তার কারণে হেলিকপ্টার চলতে পারে না, সেখানে এই বিমান পরিচালনা করতে পারলে সম্ভাবনার পুরোপুরি পরিবর্তন হবে।
বিষয়টি কল্পবিজ্ঞান নয় বরং বাস্তবায়নের পথে। মার্কিন সরকারের একটি প্রকল্পের অধীনে চলতি গ্রীষ্ম থেকেই বিভিন্ন কোম্পানিকে পণ্য ও পরে যাত্রী পরিবহনের বাস্তব পরীক্ষা চালানোর অনুমতি দেওয়া হবে। 'ইলেকট্রিক ভার্টিক্যাল টেকঅফ অ্যান্ড ল্যান্ডিং অ্যান্ড অ্যাডভান্সড এয়ার মোবিলিটি ইন্টিগ্রেশন পাইলট প্রোগ্রাম' (ইআইপিপি) নামের এই তিন বছর মেয়াদি উদ্যোগ কোম্পানিগুলোকে ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ)-এর পূর্ণ অনুমোদন পাওয়ার আগেই পরীক্ষা চালাতে দেবে। সান্টা ক্রুজভিত্তিক জবি এভিয়েশন, যার বাজার মূলধন ৭.৬ বিলিয়ন ডলার এবং টয়োটা, উবার ও ডেল্টা এয়ার লাইনসের সমর্থন রয়েছে, তারা নিউ ইয়র্ক, নিউ জার্সি, টেক্সাস ও ফ্লোরিডায় পরীক্ষা চালাবে। প্রারম্ভে তারা মালবাহী চলাচল শুরু করলেও, শিয়াররা আশা করছেন চলতি বছরের শরৎ বা শীতকালে অবাণিজ্যিক ভিত্তিতে যানী পরিবহন পরীক্ষা শুরু হবে।
আর্কার এভিয়েশন নামের আরেক কোম্পানি, যার বাজার মূলধন ৩.৭ বিলিয়ন ডলার এবং সমর্থকে ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের মতো বিনিয়োগকারী রয়েছে, তারা ২০২৮ সালের জুলাইয়ে লস এঞ্জেলেস অলিম্পিকের আগে তাদের ১২-রোরের মিডনাইট ইভিটওএল এর বাণিজ্যিক যাত্রী সেবা চালুর লক্ষ্য রেখেছে। সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও অ্যাডাম গোল্ডস্টিন বলেছেন, স্বল্প দূরত্বের অনেক যাত্রী যা গাড়িতে এক ঘণ্টার বেশি লাগে, তা আকাশপথে অনেক দ্রুত পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। অন্যদিকে, অ্যামাজন ও জিই অ্যারোস্পেসের সমর্থনপ্রাপ্ত বেটা টেকনোলজিস ১০ জুলাই ম্যারিল্যান্ড ও ভার্জিনিয়ায় ইআইপিপি-র প্রথম ফ্লাইট সম্পন্ন করেছে। বোয়িং-এর অধীনস্থ উইস্ক অ্যারো সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ইভিওটএল পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে টেক্সাসে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, প্রযুক্তির প্রতি জনগণের আস্থা অর্জনই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে একাধিক স্বতন্ত্র রোটর থাকায় ইভিটওএল প্h?ধতির একটি ত্রুটিতে বিপর্যস্ত হওয়ার ঝুঁকি একক রটরবিশিষ্ট প্রথাগত হেলিকপ্টারের চেয়ে অনেক কম। বিশ্লেষক ক্যান্টর ফিটজেরাল্ডের আন্দ্রেস শেপার্ড বলেন, বর্তমানের হেলিকপ্টারগুলো ডাইনোসরের মতো প্রাচীন। বেইন অ্যান্ড কোম্পানির পার্টনার মাটিয়া চেলি নিরাপত্তার বাস্তব ও অনুভূতিগত দিকটির কথা উল্লেখ করে বলেছেন, তড়িৎচালিত বিমান যন্ত্রপাতিগত ভাবে কম জটিল ও রক্ষণাবেক্ষণজনিত ঝুঁকি কম।
ভবিষ্যতে এফএএ-এর অনুমোদন পেলে, এই এয়ার ট্যাক্সিগুলোকে একটি নববিভাগের বেসামরিক বিমান হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে, যা কয়েক দশকের মধ্যে প্রথম। তাছাড়া, চার হাজার ফুট উচ্চতায় স্বল্প দূরত্বে ঘন ঘন চলাচলের জন্য স্বয়ংক্রিয় আকাশ ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জরুরি হয়ে উঠবে। জবি গত বছর ব্লেড এয়ার ম্বিলিটি নামের একটি হেলিকপ্টার পরিবহন সেবা প্রতিষ্ঠান কিনেছে, যার সহায়তায় তারা এয়ার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও বাণিজ্যিক পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করছে। এদিকে, ব্লেডের সিইও রব ওয়াইসেন্থাল জানিয়েছেন, চলতি গ্রীষ্ণে নিউ ইয়র্কে তারা দৈনিক ২০০টি ফ্লাইট পরিচালনা করায় জেএফকে পর্যন্ত হেলিকপ্টার যাত্রার খরচ ১৯৫ ডলারে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। বিশ্লেষকদের মত, ইভিটিএল-এর সেবা মূল্য যখন সাধারণ রাইড-শেয়ারিং-এর সমতুল্য হবে, তখনই তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেতে পারে। শিয়াররা আরও বলেন, এয়ার ট্যাক্সি মানুষর বসবাসের স্থান পছন্দ, চাকরিতে পৌঁছানোর সহজতা এবং স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে যাওয়ার মতো বিষয়গুলোকেও পরিবর্তিত করে দিতে পারে।




