ভারতের উত্তর প্রদেশের হিন্দুত্ববাদী মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের সরকার মুসলিম ঐতিহ্যের নাম বহনকারী বিভিন্ন স্থানের নাম পরিবর্তনের প্রক্রিয়া জোরদার করছে। গত অক্টোবরে লখিমপুর খেরির মোস্তফাবাদ গ্রামে এক সমাবেশে যোগী জানতে পারেন, সেখানে কোনো মুসলিম বাসিন্দা নেই—অথচ গ্রামের নাম মোস্তফাবাদ। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে নাম পরিবর্তনের নির্দেশ দেন এবং গ্রামটির নামকরণ করা হয় ‘কবির ধাম’, যা পঞ্চদশ শতাব্দীর সাধক কবিরের প্রতি উৎসর্গিত। স্থানীয় তেন্দুয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান অবতার সিং জানান, গ্রামবাসীরা প্রথমে এই পরিবর্তনের বিরোধিতা করেছিলেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, নাম পরিবর্তনের ফলে ভবিষ্যতে সন্তানদের শিক্ষা ও চাকরির কাগজপত্রে জটিলতা সৃষ্টি হবে। তবে যোগীর জোরালো সমর্থন এবং স্থানীয় কবির পন্থ আশ্রমের প্রভাবে ২০২৫ সালের ৭ নভেম্বর প্রস্তাবটি পাস হয়। অবতার সিংয়ের মতে, গ্রামটির নামকরণ হয়েছিল একটি বাগান ‘মোস্তফাবাগ’ থেকে, এবং এখানে মূলত ওবিসি ও দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করেন। মুসলিম শাসকদের ইতিহাস-ঐতিহ্য মুছে ফেলার এই প্রচেষ্টা নতুন নয়। ২০১৮ সালে এলাহাবাদ ও ফয়জাবাদ জেলার নাম পরিবর্তন করে যথাক্রমে প্রয়াগরাজ ও অযোধ্যা রাখা হয়। সম্প্রতি ৬ জুলাই শাহজাহানপুরের জালালাবাদ শহরের নাম পরিবর্তন করে ‘পরশুরামপুরী’ করার সিদ্ধান্ত নেয় মন্ত্রিসভা। পরশুরামকে বিষ্ণুর অবতার ও কুঠারধারী যোদ্ধা দেবতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ঐতিহাসিকভাবে জালালাবাদ নামটি সম্রাট আকবর অথবা জালাল–উদ্দিন ফিরোজ খিলজির নাম থেকে এসেছে বলে ধারণা করা হয়। ব্রিটিশ গেজেটিয়ার অনুসারে, এই এলাকায় মুসলিম বসতি ছিল দেরিতে। বর্তমানে এটি ক্ষয়িষ্ণু বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। গত জুনে কুশীনগরের ফাজিলনগর শহরের নাম পরিবর্তন করে ‘পাভাগড়’ বা ‘পাওয়াগড়’ রাখার ঘোষণা দেন যোগী। তিনি বলেন, জৈন তীর্থঙ্কর মহাবীরের সম্মানে এই নামকরণ করা হয়েছে। ফাজিলনগর কুশীনগর জেলায় অবস্থিত, যা বৌদ্ধ ও জৈন উভয় ঐতিহ্যের সঙ্গেই যুক্ত। ১০ জুলাই অযোধ্যায় যোগী আরও ঘোষণা দেন, ভাদরসা শহরটি ‘ভরত নগর ভরত কুন্ড’ এবং সূচিতাগঞ্জ-খিলোনি নগর পঞ্চায়েতের নাম ‘মা জাওয়ালা দেবী’ রাখা হবে। তিনি দাবি করেন, ভরত কুন্ডে ভগবান রামের ভাই ভরত ১৪ বছর বনবাসকালে অপেক্ষা করেছিলেন। এর আগে মোরাদাবাদের (লাইনপার) এলাকার নাম সাবেক কংগ্রেস বিধায়ক দাউ দয়াল খন্নার নামে রাখা হয়, যিনি রাম জন্মভূমি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আম্বেদকর নগরের আকবরপুর বাসস্ট্যান্ডের নাম পরিবর্তন করে ‘শ্রবণ ধাম বাসস্ট্যান্ড’ রাখা হয়, যা রামায়ণের শ্রবণ কুমারের প্রতি শ্রদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করেন যোগী। বিজেপির অন্যান্য নেতারাও বিভিন্ন শহরের নাম পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন। বালিয়ার বিধায়ক কেতকী সিং গাজিপুরের নাম ‘মহর্ষি গৌতম’, বেরেলির বিধায়ক ফরিদপুরের নাম ‘পীতাম্বরপুর’, এবং গাজিয়াবাদের নাম ‘মহারাজা অগ্রসেন নগর’ রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন। যোগী নিজেও আকবরপুর ও আজমগড়ের (আর্যমগড়) নাম পরিবর্তনের আভাস দিয়েছেন। ২০২৭ সালের উত্তর প্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই নাম পরিবর্তনের তৎপরতা আরও জোরদার হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের আপত্তি ও প্রশাসনিক জটিলতা সত্ত্বেও সরকার ‘সাংস্কৃতিক গৌরব পুনরুদ্ধার’ এবং হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডা বাস্তবায়নের নামে এই পরিবর্তন চালিয়ে যাচ্ছে।
উত্তরপ্রদেশে মুসলিম নামের জায়গা পরিবর্তন: যোগীর নতুন উদ্যোগে ক্ষোভ ও বিরোধিতা
ভারতের উত্তরপ্রদেশে মুসলিম-সুলভ নামের গ্রাম ও শহরের নাম পরিবর্তন করছে যোগী আদিত্যনাথ সরকার। স্থানীয় বাসিন্দাদের আপত্তি সত্ত্বেও হিন্দু পৌরাণিক নাম বসানো হচ্ছে। মুস্তফাবাদ হয়েছে কবির ধাম, জালালাবাদ হচ্ছে পরশুরামপুরী।




