শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিক্ষাব্যবস্থায় আত্মরক্ষার শিক্ষা ও বয়সোপযোগী মার্শাল আর্টকে পরিকল্পিত সহশিক্ষা কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মার্শাল আর্ট শুধুমাত্র একটি খেলা বা শারীরিক কসরত নয়; এটি শিশুর আত্মবিশ্বাস, সচেতনতা ও নিরাপত্তাবোধ গড়ে তোলার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা শিশুকে পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য প্রস্তুত করলেও বিপদের মুহূর্তে নিজেকে রক্ষা করার প্রয়োজনীয় দক্ষতা শেখানোর বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যায়। ফলে শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে শুধু বিচার বা শাস্তির দাবিতে ক্ষোভ প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা যায়; অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই শিশুকে সচেতন ও সক্ষম করে তোলার উদ্যোগ কার্যত অনুপস্থিত।
নির্যাতন নিয়ে আলোচনায় প্রায়শই মেয়েশিশুদের কথা সামনে এলেও ছেলেশিশুরাও যে যৌন, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে পারে, তা সমাজে প্রায়ই অবহেলিত থাকে। ‘ছেলেরা কাঁদে না’ বা ‘ছেলেরা শক্ত’—এ ধরনের সামাজিক ধারণার কারণে অনেক ছেলে নির্যাতনের কথা প্রকাশ করতে পারে না, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের আত্মবিশ্বাস ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। তাই লিঙ্গভেদে শিশুর নির্যাতনকে গুরুত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য করা উচিত নয় বলে মত বিশেষজ্ঞদের। এছাড়া নির্যাতনকারী যে সবসময় অপরিচিত হবে, এমন ধারণাও ভুল। আত্মীয়, প্রতিবেশী বা পরিচিত কেউই শিশুর আস্থার সুযোগ নিতে পারে। তাই শিশুকে শুধু ‘অপরিচিত মানুষের সাথে যেও না’ বললেই হবে না; তাকে শেখাতে হবে কোন আচরণ নিরাপদ, কোন আচরণ অস্বস্তিকর এবং কোন পরিস্থিতিতে দ্রুত সরে আসা প্রয়োজন।
আত্মরক্ষার প্রথম পাঠ কিন্তু কারাতে বা জুডোর মতো কৌশল নয়; বরং ‘আমার শরীর, আমার অধিকার’—এই সহজ উপলব্ধি দিয়েই শুরু হওয়া উচিত। শিশুকে বোঝাতে হবে তার ব্যক্তিগত সীমারেখা রয়েছে এবং কেউ সেই সীমা অতিক্রম করলে সে আপত্তি জানাতে পারে। অস্বস্তিকর স্পর্শে ‘না’ বলার অধিকার তার আছে, এমনকি পরিচিত কারো আচরণও সে মেনে নিতে বাধ্য নয়। কণ্ঠস্বরও আত্মরক্ষার একটি শক্তিশালী অস্ত্র; দৃঢ়ভাবে ‘না’ বলা, চিৎকার করা, দ্রুত সরে যাওয়া বা নিরাপদ মানুষের কাছে পৌঁছানো—এই কৌশলগুলোও শিশুকে শেখানো প্রয়োজন। মার্শাল আর্ট এই সামগ্রিক শিক্ষার একটি ব্যবহারিক অংশ হতে পারে, যার উদ্দেশ্য কাউকে আঘাত করা নয়, বরং শৃঙ্খলা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, মনোযোগ ও দ্রুত প্রতিক্রিয়ার দক্ষতা বিকাশ করা এবং সবচেয়ে বড় কথা, বিপদ থেকে নিরাপদে ফিরে আসা।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলাধুলা, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মতোই আত্মরক্ষা প্রশিক্ষণকে যুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে এটি শরীরচর্চাভিত্তিক খেলা হতে পারে, পরে ধীরে ধীরে বিপজ্জনক পরিস্থিতি শনাক্তকরণ, ‘না’ বলা ও আত্মরক্ষার কৌশল যুক্ত করা যেতে পারে। তবে এ বিষয়টি স্পষ্ট থাকা দরকার যে, আত্মরক্ষা প্রশিক্ষণ না জানার কারণে কোনো শিশু নির্যাতনের শিকার হলে তার দায় শিশুর নয়; দায় সম্পূর্ণ অপরাধীর। প্রশিক্ষণ শুধু শিশুর সক্ষমতা বাড়ানোর একটি উদ্যোগ, শিশুর ওপর অপরাধীর দায় চাপানোর মাধ্যম নয়। একই সঙ্গে শুধু শিশুকে আত্মরক্ষা শেখালেই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব শেষ হয় না; প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষার নীতিমালা, শিক্ষকদের আচরণবিধি এবং অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা থাকা অপরিহার্য। প্রশিক্ষকদেরও যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের আওতায় আনতে হবে, যেন নিরাপত্তার নামে নতুন কোনো ঝুঁকি তৈরি না হয়।
আত্মরক্ষার ভিত্তি হলো পরিবার। একটি শিশু জানে যে বিপদে পড়লে মা-বাবাকে বলতে পারবে, এটা তার নিরাপত্তাবোধকে অনেক শক্তিশালী করে। তাই পরিবারকে শিশুর কথা বিশ্বাস করতে হবে, মন দিয়ে শুনতে হবে এবং কোনো অবস্থাতেই তাকে দোষারোপ করা যাবে না। বর্তমান যুগে শিশুর ঝুঁকি শুধু শারীরিক জগতেই সীমাবদ্ধ নয়; ডিজিটাল জগতেও রয়েছে হয়রানি, সাইবার বুলিং এবং ব্যক্তিগত তথ্য অপব্যবহারের আশঙ্কা। তাই আত্মরক্ষার সংজ্ঞাকে আধুনিক করতে হবে—যেখানে কাকে বিশ্বাস করা যায়, ব্যক্তিগত তথ্য কোথায় দেওয়া উচিত নয় এবং অনলাইনে হয়রানির শিকার হলে কার কাছে জানাতে হবে, এ ধরনের শিক্ষাও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শিশুর নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করতে হলে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, প্রয়োজন একটি প্রতিরোধের সংস্কৃতি গড়ে তোলা; যেখানে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক এবং সমাজের সবার সমন্বিত প্রচেষ্টা থাকবে।
শিশুকে জীবনের জন্য প্রস্তুত করতে গেলে তাকে শুধু অন্যকে সম্মান করতে নয়, নিজেকেও সম্মান করতে শেখাতে হবে; শুধু নিয়ম মানতে নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ‘না’ বলতেও শেখাতে হবে। শিশু নির্যাতন বন্ধের দায়িত্ব কখনোই শিশুর নয়, কিন্তু তাকে সচেতন ও আত্মরক্ষায় সক্ষম করে তোলা আমাদের দায়িত্ব। তাই এখন সময় এসেছে, আত্মরক্ষাকে শিক্ষার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখার; মার্শাল আর্ট হোক সহশিক্ষার অংশ, আর আত্মরক্ষা হোক প্রতিটি শিশুর জীবনদক্ষতা।


