ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি’র অন্যতম প্রধান অবকাঠামোগত প্রচেষ্টা, কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট (কেএমটিটিপি), বর্তমানে গভীর সংকটে নিমজ্জিত। দেড় দশকেরও বেশি সময় ও কয়েকশো কোটি টাকা ব্যয়ের পরও প্রকল্পটি তার মূল লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে, যা ছিল উত্তর-পূর্ব্চলের রাজ্যগুলোর সঙ্গে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সরাসরি সংযোগ স্থাপন। এই স্থবিরতার পিছনে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ, কূটনৈতিক ভুল এবং ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করেছে।

শুরু থেকেই ভারতের একটি কৌশলগত ভুল ছিল শুধুমাত্র মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকার বা সামরিক জান্তার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারজুড়ে যে সশস্ত্র বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে, তা প্রকল্পটির অগ্রগতিকে পুরোপুরি থমকে দেয়। বিশেষ করে, প্রকল্পটি যে দুটি রাজ্য— রখাইন ও চিন— এর মধ্য দিয়ে গেছে, সেই দুটি এলাকাই বর্তমানে তীব্র সংঘাতের কেন্দ্রস্থল। আরাকান আর্মি নামক শক্তিশালী জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীটি ২০২৪ সালের মধ্যে কালাদান নদীপথের শেষ প্রান্ত পালেতওয়া ও সিত্তে বন্দর-সংলগ্ন পুরো অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। ফলে ভারত যার সঙ্গে চুক্তি করেছিল, সেই জান্তা সরকারের মাটিতে কোনো কর্তৃত্বই থাকে না।

এই প্রকল্পের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও দুর্বল অংশটি হলো পালেতওয়া থেকে ভারতের মিজোরাম সীমান্তের জরিনপুই পর্যন্ত ১১০ কিলোমিটারির দুর্গম সড়কপথ। এটির শেষ ৪৮.৫ কিলোমিটার পাহাড়ি বনভূমি ও সক্রিয় সংঘাত অঞ্চল হওয়ায় নির্মাণকাজ এখন সম্পূর্ণ বন্ধ। নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভেঙে পড়ায় নির্মাণ সংস্থাগুলোর কর্মী ও প্রকৌশলীরা প্রাণভয়ে কাজ ফেলে রেখে চলে গেছেন। অন্যদিকে, সমুদ্রপথ ও নদীপথের অবকাঠামো তৈরি হলেও নৌপথে গোলাবর্ষণের ঝুঁকি এবং বন্দর এলাকায় আরাকান আর্মির অবরোধের জন্য বাণিজ্যিক কার্যক্রম একপ্রকার অচল।

প্রকল্পটির ক্রমবর্ধমান ব্যয় আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয়। ২০০৮ সালে অনুমোদন লাভের সময় এর বাজেট ছিল মাত্র ১২ কোটি মার্কিন ডলার, যা বর্তমানে বেড়ে ৪৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। প্রশাসনিক জটিলতা, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং দুর্গম ভূপ্রাকৃতির কারণে নির্মাণকাজে গতি শুরুতেই ধীর ছিল।

ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতাও প্রকল্পটির ওপর প্রভাব ফেলেছে। চীন একই অঞ্চলে তাদের নিজস্ব গভীর সমুদ্রবন্দর ও চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর (সিএমইসি) নির্মাণ করছে, যা বেইজিংকে ভারত মহাসাগরে প্রবেশাধিকার দেবে। বিশ্লেষকদের মতে, চীনের প্রকল্পগুলির দ্রুত অগ্রগতি এবং স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর তাদের প্রভাব ভারতের জন্য একটি পরোক্ষ চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে।

বর্তমানে ভারত এক কঠিন কূটনৈতিক দ্ধায় রয়েছে। একদিকে জান্তার সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ করা সম্ভব নয়, অন্যদিকে আরাকান আর্মির মতো অ-রাষ্ট্রীয় শক্তির সঙ্গে সরাসরি চুক্তি করা জটিল। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়েছে এবং আরাকান আর্মি অর্থনৈতিক স্বার্থে সহযোগিতায় আগ্রহ দেখিয়েছে, তবুও বাস্তব সমাধান এখনও অধরা। ভারতের কেন্দ্রীয় ও মিজোরাম সরকার আশা করছে, ২০২৭ সালের মধ্যে করিডরটি চালু করা যাবে, তবে পর্যবেক্ষকরা এ নিয়ে খুব একটা আশাবাদী নন। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ফিরে না আসা পর্যন্ত কালাদান প্রকল্পের দরজা খোলার সম্ভাবনা ক্ষীণই থেকে যাচ্ছে।