মধ্যপ্রাচ্যের চলমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে কুয়েতের সঙ্গে একটি বিস্তৃত প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে পাকিস্তান। বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত পাঁচটি সূত্র জানিয়েছে, এই আলোচনা এখনও প্রাথমিক স্তরে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার কারণে চুক্তিটি জটিল আকার ধারণ করতে পারে বলে একটি সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে। গত বছর সৌদি আরবের সাথে পাকিস্তানের যে প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়েছিল, তা নিয়ে ইসলামাবাদে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে—কারণ সেই চুক্তির জেরে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। গত সোমবার ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবে হামলা চালানোর পর এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে। ওই হামলার জবাবে পারমাণবিক শক্তিধর দেশ পাকিস্তান ইরানকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, সৌদি আরবের ওপর যেকোনো হামলাকে তারা নিজেদের ওপর হামলা হিসেবেই গণ্য করবে। চলতি বছর কুয়েতও ইরানের বড় ধরনের হামলার শিকার হয়েছে। তাই কুয়েতের সঙ্গে পাকিস্তানের কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তি হলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

২০২৩ সাল থেকে কুয়েতের সঙ্গে পাকিস্তানের একটি সীমিত প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে, যা মূলত প্রশিক্ষণ ও যৌথ মহড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ। পাকিস্তানের একজন সরকারি কর্মকর্তা জানান, এখন কুয়েত ইসলামাবাদের কাছ থেকে সৌদি আরবের সঙ্গে করা চুক্তির অনুরূপ শক্তি প্রদর্শন আশা করছে। এর মধ্যে রয়েছে 'কুয়েতের ভূখণ্ডে হাজার হাজার পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন, যুদ্ধবিমান, ড্রোন, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম'। তবে পাকিস্তান এতদূর যেতে প্রস্তুত কি না, তা স্পষ্ট নয়। সৌদি আরবের সঙ্গে তার চুক্তিটি ছিল কয়েক দশকের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের ফসল। আলোচনার বিষয়ে অবগত পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর এক কর্মকর্তা বলেন, 'কুয়েতের চাহিদার তালিকায় সবকিছুই আছে। কিন্তু আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই, এই পর্যায়ে আমরা কোনোভাবেই যুদ্ধের জন্য সেনা পাঠানোর কথা ভাবছি না এবং ভাবতেও পারি না।'

মধ্যপ্রাচ্যের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে কুয়েত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহসহ বিভিন্ন বিষয়ে পাকিস্তানের সাথে আলোচনা করছে। তবে এটি শেষ পর্যন্ত কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তিতে রূপ নেবে কি না, তা এখনও অনিশ্চিত। রয়টার্স পাকিস্তানের চারটি এবং মধ্যপ্রাচ্যের একটি সূত্রের সাথে কথা বলেছে; তবে প্রকাশ্যে কথা বলার অনুমতি ছিল না কারোরই। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা এবং কুয়েতের তথ্য মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করা হলেও তারা সাড়া দেয়নি।

প্রতিরক্ষায় বিকল্প খোঁজার অংশ হিসেবে গত এক বছর ধরে পাকিস্তান ও উপসাগরীয় দেশগুলো নতুন আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা চুক্তির নানা সুযোগ দেখছে। পাকিস্তানের বিশাল সামরিক বাহিনী এবং নিজস্ব যুদ্ধবিমান তৈরির সক্ষমতা উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর কাছে মার্কিন সুরক্ষার একটি সম্ভাব্য বিকল্প বা অতিরিক্ত স্তর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ, মিত্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে তারা আগের চেয়ে বেশি সন্দিহান হয়ে উঠেছে। কুয়েতের নিরাপত্তা পরিকল্পনার সাথে সম্পৃক্ত মধ্যপ্রাচ্যের একটি সূত্র জানায়, কুয়েতে নিরাপত্তার জন্য পাকিস্তানের ওপর বাজি ধরা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বলে বিবেচিত হচ্ছে। সূত্রটি বলেছে, 'তারা ইতিমধ্যে সৌদির সাথে রয়েছে। তাদের প্রতিরক্ষা উন্নয়নের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। তারা সুন্নি মুসলিম এবং আমেরিকানদের সাথেও তাদের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। তাই তারা অন্যান্য বিকল্পের মতো সংবেদনশীল নয়।'

পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক একটি নতুন পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির খসড়া তৈরি করছে, যা সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের বিদ্যমান চুক্তি থেকে আলাদা। এদিকে একটি সূত্র জানিয়েছে, বাহরাইনও এমন একটি চুক্তি করতে আগ্রহী। আবার তিনটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জর্ডানও পাকিস্তানের সঙ্গে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ চুক্তির ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে।

পাকিস্তান বর্তমানে দেশের জন্য জরুরি বিনিয়োগ খুঁজছে। তাই প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে এসব প্রতিরক্ষা চুক্তিকে তারা বিনিয়োগ আনার একটি ভালো উপায় হিসেবে দেখছে। কুয়েতের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তির অংশ হিসেবে জ্বালানি নিরাপত্তায় সহায়তা চাইবে ইসলামাবাদ। পাকিস্তানের জ্বালানি মন্ত্রণালয় দেশে তেল ও জ্বালানির মজুত বাড়ানোর চেষ্টা করছে, এটি তারই একটি অংশ। আলোচনার বিষয়ে অবগত পাকিস্তানের একটি সূত্র জানায়, কুয়েত পাকিস্তানে একটি বন্ডেড জ্বালানি সংরক্ষণাগার তৈরির কথা ভাবছে। দুই দেশের সরকারের মধ্যে আগে থেকেই ডিজেল সরবরাহের চুক্তি আছে, তার ওপর ভিত্তি করেই এটি তৈরি হবে।

দুটি সূত্র জানিয়েছে, পাকিস্তানের নেতাদের কাছে বড় প্রতিরক্ষা চুক্তি করার জন্য এই প্রস্তাবগুলো যথেষ্ট আকর্ষণীয় হতে পারে। তারা আরও জানায়, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা কমলেই এ আলোচনা আরও গতি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে এটি হয়তো কেবলই একটি আকাশকুসুম কল্পনা হতে পারে। সিডনির ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক গবেষক মুহাম্মদ ফয়সাল বলেন, 'পাকিস্তানের অতিরিক্ত প্রতিশ্রুতি দেওয়ার বিপদ সম্পর্কে সচেতন থাকা উচিত।'