দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত জেলায় সম্প্রতি টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতি থেকে ধীরে ধীরে পানি নেমে যাচ্ছে। কিন্তু পানি সরে যাওয়ার সঙ্গেই ফুটে উঠছে ব্যাপক ধ্বংসের চিত্র। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এসব অঞ্চলের ৫৯টি উপজেলার ৩৬৮টি ইউনিয়ন ও ১২টি পৌরসভা প্লাবিত হয়েছিল। বন্যায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪ জনে। গতকাল সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তমন্ত্রণালয় সভায় স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সভাপতিত্ব করেন। বৈঠকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন অংশ নেন। সভা শেষে মন্ত্রী দুলু সাংবাদিকদের জানান, ইতোমধ্যে ত্রাণ বিতরণের জন্য ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে; পাশাপাশি চাল ও শুকনা খাবারও পাঠানো হয়েছে। তাঁর মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বন্যাকবলিত জেলাগুলোর ৩২৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে এখনো ১০ হাজার ৮৫৪ জন মানুষ অবস্থান করছেন।
সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কক্সবাজার জেলা। জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বন্যায় সাত লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং সাত খাতে মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৯০ কোটি টাকা। জেলাটির ২ হাজার ৪৮ কিলোমিটার সড়ক ও ৭৯টি সেতু-কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষি ও মৎস্যখাতেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, ১০ হাজার ৪০১ একর জমির ফসল নষ্ট হয়ে গেছে এবং ২ হাজার ৪৪০ হেক্টর পুকুর ও চিংড়িঘেরের মাছ ভেসে গেছে। এতে অন্তত ৪৩ হাজার ২১০ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
পাহাড়ি জেলা বান্দরবানে যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সড়ক ও জনপথ বিভাগ ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতাধীন প্রায় ১৫১ কিলোমিটার সড়ক ও চারটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ৪৭টি স্থানে পাহাড়ধস ও ২১টি স্থানে গাছ উপড়ে পড়ে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। জরুরি ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামতে সাত কোটি টাকা এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্নির্মাণে প্রায় ৪০ কোটি টাকার প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন। রাঙামাটিতেও সড়ক খাতে প্রাথমিকভাবে ৯ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলের গ্রামীণ সড়কগুলো বিপর্যস্ত। লোহাগাড়ায় অন্তত ৩০ কিলোমিটার সড়ক ও ১৭টি কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাঁশখালীতে ১১০ কিলোমিটার সড়ক, ২৫টি কালভার্ট ও দুটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; উপজেলা প্রকৌশল কার্যালয়ের হিসাবে এতে ১৫ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে।
বন্যায় সবচেয়ে বেশি নাজুক অবস্থায় পড়েছে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত। লোহাগাড়া উপজেলা কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে ১৬ হাজার ৫০০ কৃষকের প্রায় ৬০ কোটি টাকার ফসল নষ্ট হয়েছে। ওই এলাকায় ১ হাজার ৬২০টি পুকুর ও মাছের খামার ডুবে প্রায় ৮ কোটি টাকার মাছ ভেসে যায়। প্রাণিসম্পদ বিভাগের মতে, খামার, পশুপাখি ও খাদ্যের ক্ষতি মিলিয়ে লোকসান প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি টাকা। রাঙামাটিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কৃষিতে; জেলা কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তরের প্রাথমিক হিসাবে দশ উপজেলায় ৩ হাজার ৬৭৫ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খাগড়াছড়িতে প্রায় ১ হাজার ৩১ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। বান্দরবানে তলিয়ে গেছে প্রায় ৫ হাজার ২৬০ একর জমির ফসল।
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ভাষ্যে উঠে এসেছে চরম বেদনার চিত্র। খাগড়াছড়ির মহালছড়ির চাষি অজয় বড়ুয়া জানান, শুধু ঘরবাড়ি নয়, তার পুকুরের পাঁচ লাখ টাকার মাছও ভেসে গেছে। পুনরায় কীভাবে শুরু করবেন তা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। বান্দরবানের শীলক খালের উত্তর পাড়ের বাসিন্দা মোহাম্মদ পারভেজ ও তার প্রতিবেশী জেবেল মুল্লুক প্রাণে বেঁচেছেন অল্পের জন্য। তাদের বাড়িতে পাহাড়ি ঢলের স্রোত প্রবেশ করায় তারা দ্রুত বেরিয়ে আসেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাদের ঘর স্রোতে ভেসে পাশের বেইলি সেতুর ওপর আছড়ে পড়ে। ফিরে এসে তারা দেখেন, বসতঘরের জায়গায় এখন শুধু ধ্বংসস্তূপ। এসব এলাকায় এখনো অনেকে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকছেন এবং পানি পুরোপুরি না নামায় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনও সম্ভব হয়নি।




