চট্টগ্রাম নগরীতে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও অন্যান্য যানবাহনের চালকদের এখন দিনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কাটছে ফিলিং স্টেশনের দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে। আগে যেখানে ২০ থেকে ৩০ মিনিটে গ্যাস নিয়ে রাস্তায় বের হওয়া যেত, সেখানে এখন চার থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও অনেকেই গ্যাস পাচ্ছেন না।
সরেজমিনে আকবরশাহর পাহাড়িকা সিএনজি ফিলিং স্টেশন, ষোলশহরের ফসিলসহ নগরের একাধিক স্টেশনে দেখা গেছে, অর্ধশতাধিক গাড়ি দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষমাণ। চালক আবু তৈয়ব জানান, তিনি ভোর চারটা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পরও পাঁচ ঘণ্টা পরেও গ্যাসের দেখা পাননি। রাতটিও গাড়ির ভেতরেই কেটেছে। ‘গ্যাস নিতে নিতেই অর্ধেক দিন চলে যায়। এরপরে রাস্তায় নেমে আর কত টাকা ভাড়া মারব? মালিককে জমা দিতে হবে, সংসারও চালাতে হবে,’ বলেছেন তিনি।
অপর এক চালক মোহাম্মদ আবুল কাশেম জানালেন, গতকাল আট ঘণ্টা লাইনে থাকার পর গ্যাস নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল, যা মাত্র দুই ঘণ্টা গাড়ি চালানোর পরই শেষ হয়ে যায়। তাই আজ ভোর ছয়টায় তিনি পুনরায় সারিতে এসে দাঁড়িয়েছেন। চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ না থাকায় এমন সংকট তৈরি হয়েছে।
যানবাহন চালকদের মতে, সাধারণত দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা রাস্তায় গাড়ি চালিয়ে যে আয় হতো, এখন তার সিংহভাগ ফিলিং স্টেশনের লাইনে অপচয় হচ্ছে। এতে একদিকে দৈনিক নির্ধারিত জমা অর্থ তুলতে হিমশিম খেতে হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবার চালাতে গিয়ে কেউ কেউ ধার করতে বাধ্য হচ্ছেন। কোনো কোনো চালক এই লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করছেন। ফতেয়াবাদ রুটের এক মিনিবাস চালক মো. নাহিদ জানান, যে দিনগুলোতে তার দেড় থেকে দুই হাজার টাকা আয় হয়, গতকাল তিনি মাত্র ৬০০ টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
এই ভয়াবহ সংকটের সূত্রপাত ঘটে গত ২১ জুলাই মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের মাধ্যমে। এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ওই টার্মিনালটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে ওঠার সম্ভাবনা নেই বলে সংশ্লিষ্টরা ইঙ্গিত দিয়েছেন।
কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি (কেজিডিসিএল) সূত্রে জানা গেছে, আজ সকাল আটটা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় প্রতিষ্ঠানটি মাত্র ১৯ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রাপ্ত হয়েছে। অথচ তাদের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুট। প্রায় ১৬ কোটি ঘনফুটের ঘাটতি নিয়ে সরবরাহ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। কেজিডিসিএল জানিয়েছে, দৈনিক চাহিদার প্রেক্ষিতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য প্রায় ১৫ কোটি, শিল্পকারখানার জন্য ৯ কোটি, আবাসিক খাতে ৬ কোটি এবং সিএনজির জন্য ৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হয়। কিন্তু কম বরাদ্দের ফলে সব কয়টি খাতেই সমন্বয় করে কম চাপে সরবরাহ দিতে বাধ্য হচ্ছে তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেজিডিসিএলের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন, পেট্রোবাংলার বরাদ্দ মোতাবেক গ্যাস বিতরণের ফলে কোনো খাতের পূর্ণ চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটিতে মেরামত তৎপরতা জোরদার রয়েছে। একটি বিশেষজ্ঞ দল দ্রুততম সময়ের মধ্যে টার্মিনাল চালু করতে নিরলস পরিশ্রম করছেন, এবং আশা প্রকাশ করা হয়েছে যে চলতি সপ্তাহের মধ্যভাগেই গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পারে।




