রাজধানীর গুলিস্তান ফ্লাইওভার সংলগ্ন ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট-১ এবং এর বিপরীতের ঢাকা ট্রেড সেন্টার—এই দুই স্থাপনাকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি জুতার বাজার। দেশের বিভিন্ন আধুনিক শোরুম বা অনলাইন বিপণন প্ল্যাটফর্মে প্রদর্শিত রঙিন ও আকর্ষণীয় জুতাগুলোর সিংহভাগের সূচনা ঘটে এখানকার সরু পথগুলোতে। মার্কেটের নিচতলায় ‘আলম ফুটওয়্যার’-এর মতো দোকানের কাচের দরজায় ‘এখানে খুচরা বিক্রয় হয় না’ লেখা একটি নির্দেশিকা পরিষ্কারভাবে ইঙ্গিত করে, জায়গাটি পুরোপুরি পাইকোল ব্যবসার জন্য নির্ধারিত।

রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলের খুচরা ব্যবসায়ী ও নবীন উদ্যোক্তাদের পদচারণায় মুখর থাকে এই কেন্দ্র। ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির এলএলবির শিক্ষার্থী মো. নাঈম মিয়া ও সাখাওয়াত হোসেনের মতো তরুণেরা এখান থেকে পাইকোল দরে পণ্য সংগ্রহ করে ‘পিলো টাচ’ নামের ফেসবুক পেজে বিক্রি করে থাকেন। প্রথম দিকে কেবল ফরমাল জুতা বিক্রি করলেও, বর্তমানে লোফারসহ বিভিন্ন ডিজাইনের পরিধি বাড়াচ্ছেন তাঁরা। আলম ফুটে-ওয়্যারের স্বত্ত্বাধিকারী সাইফুল আলম জানান, তারা নিজস্ব নকশার পাশাপাশি বিক্রেতাদের দেওয়া পছন্দমতো নমুনায় ও তাদের নিজস্ব ব্র্যান্ড নামে জুতা তৈরি করে দিতে সক্ষম।

বিশাল এই বাণিজ্যিক ক্ষেত্রটি ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেটের নিচতলা থেকে চারতলা পর্যন্ত জুতার দোকানে পূর্ণ। পাঁচ থেকে সাততলা জুড়ে রয়েছে পণ্যের গুদাম। ‘ঈগল সম্রাট সুজ’, ‘আফজাল সুজ’, ‘মান্নান সুজ’, ‘বৈশাখী সুজ’সহ পাঁচ শতাধিক প্রতিষ্ঠানের সমাবেশে এ বাজার গড়ে উঠেছে। অপর পাশের ঢাকা ট্রেড সেন্টারের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা মূলত আমদানি করা জুতার জন্য বরাদ্দ। চটি, স্নিকার্স, লোফার, চেলসি বুট, নারী-পুরুষের স্যান্ডেল থেকে শুরু করে শিশুদের জুতো—সব ধরনের পণ্যই এখানে পাওয়া যায়। পুরান ঢাকা, সিদ্দিকবাজার, সাভার ও জুরাইন এলাকার কারখানায় তৈরি দেশীয় পণ্যের পাশাপাশি আনা হয় বিদেশি জুতাও। কিছু কিছু ক্ষেত্রে জুতার উপরিভাগ ও তলা আলাদাভাবে বিদেশ থেকে এনে দেশে সংযোজন করা হয়। আফজাল সুজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপক মো. নাসির উদ্দিনের মতে, সম্পূর্ণ আমদানি করা জুতার চেয়ে স্থানীয়ভাবে তৈরি ও ফিটিং করা জুতার দাম কম হওয়ায় ক্রেতাদের আগ্রহ দেশীয় পণ্যের প্রতিই বেশি।

এই বাজারের প্রায় তিন দশকের পুরোনো প্রতিষ্ঠান ‘ঈগল সম্রাট সুজ’। তাদের বিক্রি ব্যবস্থাপনা একেবারেই নিজস্ব। অন্যান্য দোকানের মতো জুতা প্রদর্শনের বদলে এখানে থরেথরে জুতার বাক্স। মেজেতে বসেই ক্রেতা-বিক্রেতার সব লেনদেন সম্পন্ন হয়, যা পুরনো দিনের আড়তের পরিবেশ ফিরিয়ে আনে। প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার মোহাম্মদ সফিকুল ইসলামের ধারণা, এ পদ্ধতি ক্রেতার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যম। আফজাল সুজের ব্যবস্থাপক নাসির উদ্দিনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, টেবিলের পরিবর্তে মেজেতে বসে ক্রেতাকে একসঙ্গে শতাধিক জুতা ছড়িয়ে দেখানো যায়, যা লেনদেনে বাড়তি সুবিধা আনে।

দামের দিক থেকে এ বাজার অত্যন্ত সুলভ। শিশুদের জুতার দাম শুরু হয় ১৭০ টাকা থেকে, মেয়েদের জুত ৩০০ থেকে ৯৫০ টাকায় এবং ছেলেদের জুত ৫০০ থেকে দেড় হাজার টাকার ভেতরেই মেলে। সরাসরি চীন থেকে আমদানি করা একই নকশার জুতার মূল্য দেশীয় কারখানায় উৎপাদিত জুতার চেয়ে পাঁচ শত টাকা বেশি। যেমন, ভিক্টোরিয়া ট্রেডিং-এর কর্ণধার সাকিবুর রহমান জানান, ১,২০০ টাকার একটি জুত দেশে উৎপাদিত হলে ৭০০ টাকায় পাওয়া সম্ভব। এখানকার প্রায় প্রতিটি দোকানেই তিন মাসের ওয়ারেন্টি প্রচলিত আছে, যার মেয়াদে কোনো সমস্যা হলে বিনামূল্যে সমাধানের ব্যবস্থা করা হয়।

এ বাজারের নিয়ম-কানুন অন্যান্য বাজার থেকে কিছুটা ভিন্ন। সাধারণত সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে এবং সকালবেলা ক্রেতার সংখ্যা বেশি হয়। দূর-দূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীরা সকালে পণ্য বেছে নিয়ে দিনে শেষে নিজ এলাকায় চলে যান। পাইকা কারবারে জুত সাধারণত জোড়া বা ডজন হিসেবে কার্টনে বিক্রি হয়, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান কমপক্ষে ৬ জোড়া জুতার অর্ডার নিয়ে থাকে। বর্তমানে অনলাইনে যোগাযোগ, পণ্য ছবি দেখে অর্ডার এবং পণ্য পাঠানোর পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ঋতু পরিবর্তনের সাথে বাজারের সংগ্রহেরও রূপ বদলায়; বর্ষায় প্লাস্টিকের স্যান্ডেল, উৎসব এলে পার্টি ও বিয়ের নাগরা জুতোর চাহিদা বেড়ে যায়।

নতুন ও পুরনো ক্রেতাদের জন্য জুতার মান যাচাইয়ের কয়েকটি প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দিয়েছেন ভিক্টোরিয়া ট্রেডিং-এর সাকিবুর রহমান। একটিমাত্র দোকানে না থেমে অন্তত চার-পাঁচটি দোকান ঘুরে জুতার মান ও মূল্য যাচাই করে নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। সোলের স্থায়িত্ব, ফিনিশিং, এবং পেস্টিং ভালো কি না তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। নকল পণ্য এড়াতে লোগো, রং এবং গঠনের উপর নজর রাখতে হবে; যেমন অনেক সময় দেখা যায় জাল পণ্যে ‘অ্যাডিডাস’-এর বদলে ‘এডিডোস’ লেখা থাকে। পাশাপাশি বড় উৎসবের অন্তত এক মাস আগে বাজারে নতুন পণ্য এসে যায়। অন্যদিকে ২৩ বছরের ব্যবসায়ী অভিজ্ঞতা থেকে ঈগল সম্রাট সুজের ইকবাল উদ্দিন আহমদ নতুন ব্যবসায়ীদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেন। প্রথমত, হুট করে ব্যবসা না শুরু করে কমপক্ষে এক বছর অন্য কোনো জুতার দোকানে কাজ করে অভিজ্ঞতা নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। দ্বিতীয়ত, দোকানের স্থান হতে হবে জনসমাবেশ সম্পন্ন এলাকা। তৃতীয়ত, খুব ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করেই পাইকাতি পণ্য কিনতে হবে। এবং চতুর্থত, কোনো এলাকার মানুষের নির্দিষ্ট পছন্দকে প্রাধান্য দিয়ে জুতার সংগ্রহ নিলে ব্যবসা লাভজনক হয়ে ওঠে।