ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস তাদের বহরে ২১টি নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত করে বড় ধরনের সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রী পরিবহনের বাজার বছরে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকার। এর মধ্যে দেশীয় বিমান সংস্থাগুলোর অংশীদারি মাত্র ৩০ শতাংশ, বাকি ৫৬ হাজার কোটি টাকার বাজার বিদেশি কোম্পানিগুলোর দখলে। ফলে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত করে ২০২৭ সালের মধ্যে ইউএস-বাংলার বাজার অংশীদারি ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন উড়োজাহাজগুলোর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় কলকাতা, চেন্নাই, মালদ্বীপে ফ্লাইট সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, কাঠমান্ডু ও কলম্বোতে নতুন ফ্লাইট চালু হবে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ব্যাংকক, কুয়ালালামপুর ও সিঙ্গাপুরের ফ্রিকোয়েন্সি বাড়ানো হবে এবং ব্রুনেই, জোহর বাহরু ও পেনাংয়ে ফ্লাইট সম্প্রসারণ করা হবে। পূর্ব এশিয়ায় চীনের গুয়াংজু ছাড়াও কুনমিং, শেনজেন, বেইজিং, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে দুবাই, আবুধাবি, শারজাহ, জেদ্দা, রিয়াদ, দোহা ও মাসকাটে ফ্লাইট বাড়ানোর পাশাপাশি কুয়েত, মদিনা, দাম্মাম ও সালালাতে নতুন রুট যুক্ত হবে।
চট্টগ্রাম ও সিলেটকে হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে ইউএস-বাংলা। আগামী বছরের মধ্যে এই দুই বিমানবন্দরে চারটি ও দুটি করে বোয়িং উড়োজাহাজ রাখা হবে এবং রক্ষণাবেক্ষণের কাজও সেখানে করা হবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম থেকে ৭০ শতাংশ যাত্রী বিদেশি তিনটি বিমান সংস্থা পরিবহন করছে। নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হলে এসব অঞ্চল থেকে মধ্যপ্রাচ্যসহ আন্তর্জাতিক গন্তব্যে সরাসরি ফ্লাইট চালু হবে, যা স্থানীয় কর্মসংস্থান বাড়াবে।
এভিয়েশন খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে মামুন বলেন, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, নীতিগত সহায়তার ঘাটতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের দীর্ঘসূত্রতা প্রধান সমস্যা। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ৫০ বছরের পুরোনো এবং একটি রানওয়ের ওপর নির্ভরশীল। ঢাকার কাছাকাছি নতুন বিমানবন্দর নির্মাণ জরুরি। এছাড়া বাংলাদেশে বিমানবন্দর মাশুল, ল্যান্ডিং-পার্কিং ফি, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং চার্জ ও যাত্রী কর প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে অনেক বেশি। ফলে ভাড়াও বেশি। তিনি সমতাভিত্তিক ও প্রতিযোগিতাবান্ধব ব্যবসায়িক পরিবেশ চান, যাতে দেশীয় বিমান সংস্থাগুলো নিজেদের সক্ষমতায় এগিয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে মামুন মনে করেন, আগামী ১০ বছর এই শিল্পের জন্য ‘স্বর্ণালি দশক’ হতে পারে। বর্তমানে আকাশপথে ভ্রমণ বাড়ছে ৮-১০ শতাংশ হারে। দক্ষিণ এশিয়ার এভিয়েশন হাব হতে হলে নতুন বিমানবন্দরে লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড, গ্লোবাল ফুড চেইন ও ডিউটি ফ্রির ব্যবস্থা রাখতে হবে। পাশাপাশি ইউরোপ-আমেরিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পাসপোর্টধারীদের জন্য অন-অ্যারাইভাল ভিসা চালু এবং ইমিগ্রেশন পুলিশকে আলাদা ইউনিট হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন তিনি।
দক্ষ জনবলের ঘাটতি মেটাতে ইউএস-বাংলা নিজস্ব উদ্যোগে ইতিমধ্যে ২৮ জন তরুণকে যুক্তরাষ্ট্রে পাইলট প্রশিক্ষণে পাঠিয়েছে। এ বছর আরও ২০০ জনকে পাইলট এবং ১০০ জনকে এয়ারক্রাফট প্রকৌশলী হিসেবে বিদেশে প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পূর্বাচলে ২০০ বিঘা জমিতে আন্তর্জাতিক মানের এভিয়েশন ট্রেনিং সেন্টার স্থাপন করা হবে।
ইউএস-বাংলার পাশাপাশি এয়ার অ্যাস্ট্রা নামে নতুন বাজেট এয়ারলাইনস চালুর কারণ ব্যাখ্যা করে মামুন বলেন, বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় এয়ারলাইনস গ্রুপগুলোর মতো ফুল-সার্ভিস ও বাজেট—দুই ধরনের সেবা দেওয়ার কৌশল থেকেই এই উদ্যোগ।
এয়ার কার্গো খাতের সম্ভাবনা প্রসঙ্গে তিনি জানান, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক এয়ার কার্গো পরিবহন খরচ ১৪০ কোটি ডলারের মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশ দেশীয় সংস্থাগুলো বহন করে। বাকি ৯৫ শতাংশ বিদেশি অপারেটরদের মাধ্যমে যায়। সঠিক নীতিগত সহায়তা পেলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক কার্গো হাব হতে পারে। ইউএস-বাংলা ভবিষ্যতে একটি স্বতন্ত্র কার্গো এয়ারলাইনস চালুর পরিকল্পনা করছে।
পর্যটন ও এভিয়েশনকে একসঙ্গে দেখার ওপর জোর দিয়ে মামুন বলেন, দুবাই, সিঙ্গাপুর ও তুরস্কের মতো দেশগুলো এই দুটি খাতকে একীভূত কৌশলের অংশ হিসেবে দেখেছে। বাংলাদেশেও কক্সবাজারে পর্যটন বাড়ার কারণে ইউএস-বাংলা ও এয়ার অ্যাস্ট্রা মিলিয়ে দৈনিক ১৬টি ফ্লাইট পরিচালনা করছে। আন্তর্জাতিক পর্যটন ব্র্যান্ডিং, ই-ভিসা সম্প্রসারণ ও অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে মামুন বলেন, ইউএস-বাংলাকে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্লোবাল এভিয়েশন গ্রুপে পরিণত করার লক্ষ্য। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ায় ফ্লাইটের জন্য ওয়াইড বডি এয়ারক্রাফট যুক্ত করার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে। এছাড়া বাংলাদেশে একটি অত্যাধুনিক ফ্লাইট ক্যাটারিং সেন্টার স্থাপনের জন্য বেবিচক থেকে জায়গা বরাদ্দ পাওয়া গেছে, যেখানে চীনা ও ইউরোপীয় শেফ নিয়োগ দেওয়া হবে। তিনি মনে করেন, এভিয়েশনকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রে আনতে পারলে আগামী দুই দশকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ এভিয়েশন শক্তিতে পরিণত হবে।




