পরিচ্ছন্নতা ও কাপড়ের যত্নের প্রয়োজনীয়তা থেকে গড়ে ওঠা ডিটারজেন্ট পাউডার খাত এখন দেশের কর্পোরেট জগতে একটি নিরব সফল উদ্ভাবনে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এই পণ্যের বাজার গত পাঁচ বছরে দ্বিগুণেরও বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। বিভিন্ন কোম্পানির দেওয়া তথ্য বলছে, বাংলাদেশের ডিটারজেন্টের বাজারের বর্তমান আকার ৪ হাজার ৫০০ কোটি থেকে ৫ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হতে পারে। টাকার অঙ্কে গত পাঁচ বছরে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পেছনে মূল্যবৃদ্ধি বড় ভূমিকা পালন করলেও, মানুষরে মাথাপিছু ব্যবহার বেড়েছে মাত্র ২ শতাংশ। দেশের বাজারে এখন প্রায় দুই লাখ টন ডিটারজেন্ট সরবরাহ করা হয়।
বাজারের চিত্র বদলে গেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। পূর্বে কাপড় কাচার সাবানের চল থাকলে এখন তার ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে কমে গিয়ে ডিটারজেন্ট পাউডার ও তরল ডিটারজেন্টের দখল বেড়েছে। বিশেষ করে ভবিষ্যতের জন্য তরল (লিকুইড) ডিটারজেন্টের সম্ভাবনাকে সবচেয়ে উজ্জ্বল হিসেবে চিহ্নিত করছেন সংশ্লিষ্টরা। একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ২০২০ সালের জরিপ অনুযায়ী, তখন বাজারের আয়তন ছিল ৭৭ হাজারে ৩৮২ টন, যার মূল্যমান ছিল ২ হাজার ৬৭১ কোটি টাকা।
দীর্ঘদিন ধরে এই বাজারের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ দখল করে রেখেছে বহুজাতিক কোম্পানি ইউনিলিভার। তবে গত দুই-তিন দশকে দেশীয় কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণও জোরালো হয়েছে। ইউনিলিভার, কোহিনুর কেমিক্যাল, স্কয়ার টয়লেট্রিজ, কল্লোল গ্রুপ এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠান আরএসপিএল সম্মিলিতভাবে বাজারের ৯৫ শতাংশ পণ্য সরবরাহ করে। দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে কল্লোল গ্রুপের অধিগ্রহণ করা ‘জেট’ একটি উল্লেখযোগ্য নাম। ১৯৬৮ সালে কোহিনুর কেমিক্যালের হাত ধরে যাত্রা শুরু করা জেট বর্তমানে জাপানি প্রযুক্তি ও মাল্টি-এনজাইম ফর্মুলা ব্যবহার করে কাপড় পরিষ্কারের পাশাপাশি এর যত্ন ও বুননের সুরক্ষা নিশ্চিত করছে। গ্রুপটির সিনিয়র মার্কেটিং ম্যানেজার ইশরাত চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেছন, দীর্ঘ ঐতিহ্য, নির্ভরযোগ্য মান ও ভোক্তার আস্থাই জেটের মূল শক্তি।
অন্যদিকে, এই শিল্পের প্রধান কাঁচামাল যেমন ল্যাবসা, সোডা ও অ্যাশ সম্পূর্ণভাবে আমদানিনির্ভর। ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে, যা উৎপাদন ব্যয়কে বাড়িয়ে দিয়েছে। ইউনিলিভার বাংলাদেশের বিপণন ব্যবস্থাপক হোসেন মোহাম্মাদ সাররাম উল্লেখ করেন, কোভিড-উত্তর অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের পর উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তিন বছর পর পণ্যের দাম বাড়াতে হয়েছে। কাঁচামালের মূল উপাদান তেল থেকে আসে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থা সরবরাহের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দেশীয় কোম্পানিগুলো উৎপাদনে দক্ষতা বাড়িয়ে এবং উন্নত কাঁচামাল ব্যবহারের মাধ্যমে ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থেকে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার চেষ্টা করে যাচ্ছে।
তরল ডিটারজেন্টের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্কয়ার টয়লেট্রিজের বিপণন প্রধান ড. জেসমিন জামান মন্তব্য করেছেন যে, ওয়াশিং মেশিনের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার এবং দ্রুত কাপড় ধোয়ার অভ্যাসের কারণে এ খাতের প্রবৃদ্ধি চমৎকার হবে। তার পূর্বাভাস, আগামী পাঁচ বছরে পুরো লন্ড্রি ক্যাটাগরির বাজার দাঁড়াবে ছয় হাজার কোটি টাকায়, যার মধ্যে ডিটারজেন্টের অংশ পাঁচ হাজার কোটি। বর্তমানে মোট ব্যবহারের ৬৫ শতাংশ গ্রামীণ এবং ৩৫ শতাংশ শহরে অঞ্চলে হয়।
সার্বিকভাবে, একসময়ে সম্পূর্ণ বিদেশি ব্র্যান্ডের ওপর নির্ভরশীল থাকা এই খাতে এখন দেশীয় কোম্পানিগুলো তাদের মান, সাশ্রয়ী মূল্য ও সহজলভ্যতার কারণে বড় একটি শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ই-কমার্স থেকে শুরু করে প্রান্তিক মুদিদোকানেও এদের পণ্য পৌঁছে গেছে, যা কেবল আমদানি নির্ভরতা ও বৈদেশিক মদ্রার ব্যয়ই কমাচ্ছে না, স্থানীয় কাঁচামাল খাত ও কর্মসংস্থানেও অবদান রাখছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, উন্নত প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ও কার্যকর বিপণন ধরে রাখতে পারলে এই ‘নীরব বিপ্লব’ দেশের ডিটারজেন্ট শিল্পকে কেবল অভ্যন্তরীণ নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও সুসংহত অবস্থান তৈরি করে দেবে।




