খুলনা জেলা জুড়ে প্রাথমিক শিক্ষায় বড় ধরনের জনবল সংকট দেখা দিয়েছে। জেলার মোট ১ হাজার ১৫৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে বর্তমানে ৬০৫টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। অর্থাৎ জেলার অর্ধেকের বেশি বিদ্যালয়ে এই পদটি খালি। অন্যদিকে, কয়রা উপজেলার পরিস্থিতি আরও গুরুতর। সেখানে ১৪২টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮৫টিতে, যা প্রায় ৬০ শতাংশ, কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই। এই ৮৫টি বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২২ হাজার ৮০৬ জন।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের পর কয়রায় কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরাসরি প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়নি। শূন্য পদগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— গোবরা ঘাটাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর মদিনাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ মদিনাবাদ মুসাফিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, স্বর্ণকলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ মহারাজপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৩ নম্বর কয়রা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২ নম্বর কয়রা মধ্যবিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শ্যামখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও শ্রীরামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। শুধু তাই নয়, উপজেলায় সহকারী শিক্ষকের ৪২টি পদও বর্তমানে খালি পড়ে আছে।

শিক্ষার্থীদের অভিভাবক হাবিবুর রহমানের ছেলে গোবরা ঘাটাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। তিনি বলেন, প্রধান শিক্ষকের অভাবে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। তাঁর মতে, দ্রুত স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম গতিশীল করা জরুরি।

এই সংকটের পেছনে মামলা-জটিলতাকে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কয়রার স্বর্ণকলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নুরুল আমিন জানান, রেজিস্টার্ড থেকে সরকারি হওয়া ১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদমর্যাদা সংক্রান্ত একটি মামলা এখনো বিচারাধীন। এই মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়ায় ওই বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের পদোন্নতি ও পদায়ন সম্ভব হচ্ছে না।

দীর্ঘদিন ধরে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন অনেকে। ছয়জন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, তাদের একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান এবং বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজ সামলাতে হচ্ছে। অফিসের নথিপত্র সংরক্ষণ, সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন, প্রতিবেদন তৈরি, হিসাব-নিকাশ— সব কাজের চাপে পাঠদানের জন্য সময় ও মনোযোগ দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাই মূল দায়িত্ব; কিন্তু প্রশাসনিক কাজের অতিরিক্ত চাপে সেই দায়িত্ব পালন প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন।

গোবরা ঘাটাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. বিল্লাল হোসেন বলেন, ২০২৩ সাল থেকে তিনি এই দায়িত্বে রয়েছেন। বিদ্যালয়ে ১৫৭ জন শিক্ষার্থী এবং তিনিসহ পাঁচজন সহকারী শিক্ষক রয়েছেন। নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি সব প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কাজ তাঁকেই করতে হয়। তাঁর মতে, দ্রুত একজন স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দিলে বিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রম আরও সুষ্ঠু হবে।

কয়রা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়েও জনবল ঘাটতি প্রকট। পাঁচটি সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পদের মধ্যে তিনটি এবং অফিস সহকারীর চারটি পদই দীর্ঘদিন ধরে খালি রয়েছে।

খুলনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শেখ অহিদুল আলম জানান, সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) ও অধিদপ্তরের মাধ্যমে নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে শূন্য পদগুলো ধাপে ধাপে পূরণ হবে বলে আশা করছেন তিনি।

সর্বশেষ ২০১৩ সালে সরাসরি প্রধান শিক্ষক নিয়োগ হয়েছিল বলে জানান কয়রা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তপন কুমার কর্মকার। তিনি বলেন, শূন্য ১৬টি পদে চলতি দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। কিছু পদে পদায়নের উদ্যোগ থাকলেও মামলা-জটিলতার কারণে সম্ভব হয়নি। তিনি এটিকে জাতীয় পর্যায়ের সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন।