আঙ্কারায় ৩৬তম ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের উদ্বোধনের আগের রাতে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে এক ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। স্থানীয় সময় ৬ জুলাই গভীর রাতে এই আক্রমণ সংঘটিত হয়, যেখানে ৬৮টি ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৩৫১টি ড্রোন ও ডেকয় নিক্ষেপ করা হয়। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে ৫ জুলাই এই হামলার পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। এটি তুরস্কের আঙ্কারায় ৭ ও ৮ জুলাই অনুষ্ঠেয় ন্যাটো সম্মেলনের প্রাক্কালে মস্কোর একটি সুপরিকল্পিত শক্তি প্রদর্শন বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কিয়েভ শহরে। নগর প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে অন্তত ১৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। পোদিল ও দার্নিৎস্কি জেলায় ধ্বংসের মাত্রা ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। কেন্দ্রীয় পোদিল জেলায় একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নয়তলা একটি আবাসিক ভবনের পঞ্চম থেকে নবম তলা পর্যন্ত বিধ্বস্ত করে দেয়, ফলে ভবনের ওপরের অংশ ঝুলন্ত অবস্থায় খুলে যায়। দমকলকর্মীরা সেখান থেকে ১৭ জন বাসিন্দাকে উদ্ধার করেন এবং সিঁড়ি ব্যবহার করে আরও ২৮ জনকে ওপরের তলা থেকে নিরাপদে সরিয়ে আনেন। দক্ষিণ-পূর্ব দার্নিৎস্কি জেলায় পড়ন্ত ধ্বংসাবশেষে একটি ২৫-তলা ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং একটি ৩০-তলা টাওয়ারে আগুন জ্বলে ওঠে। শহরের অন্যত্র হামলার ফলে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ড থেকে নির্গত ঘন কালো ধোঁয়ায় কিয়েভের আকাশরেখা ঢেকে যায়। কিয়েভ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পাঁচ মাইল দূরে ভিশনেভ শহরে একটি গোলাবারুদের ডিপোতে রুশ হামলার পর কয়েক ঘণ্টা ধরে গৌণ বিস্ফোরণ ঘটতে থাকে, যার ফলে ৫০০ বাসিন্দাকে সরিয়ে নেওয়া হয়। ইউক্রেন সরকার সর্বমোট কমপক্ষে ২৮ জন নিহত এবং প্রায় ১০০ জন আহতের তথ্য নিশ্চিত করেছে।

ইউক্রেনীয় বিমানবাহিনী জানিয়েছে, তারা ৩৭টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ৩২৬টি ড্রোন ভূপাতিত করতে সক্ষম হলেও রাশিয়ার নিক্ষেপ করা ২৯টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের একটিও প্রতিহত করতে পারেনি। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি শূন্য প্রতিরোধের হারকে ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের তীব্র সংকটের সাথে যুক্ত করে পরোক্ষভাবে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতির দিকে ইঙ্গিত করেন, যা ইউক্রেনের হাতে থাকা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসে সক্ষম একমাত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি যুক্তি দেন যে, প্রায় অচলাবস্থায় থাকা এই যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারিত হবে 'আকাশের যুদ্ধের' মাধ্যমে। তিনি স্বীকার করেন, অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক আকাশ প্রতিরক্ষা তার দেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। প্যাট্রিয়ট পিএসি-৩ ক্ষেপণাস্ত্রের ভয়াবহ ঘাটতির কথা উল্লেখ করে জেলেনস্কি বলেন, কখনো কখনো সরবরাহকৃত চালান আসে বিক্ষিপ্তভাবে।

অন্যদিকে, প্রায় একই সময়ে ইউক্রেন গভীর অভিযান চালিয়ে পশ্চিম সাইবেরিয়ায় অবস্থিত ওমস্ক তেল শোধনাগারে আঘাত হেনেছে, যা কিয়েভের ইতিহাসে রাশিয়ার অভ্যন্তরে সবচেয়ে দূরবর্তী হামলা বলে মনে করা হচ্ছে। বার্ষিক ২২ মিলিয়ন টন পরিশোধন ক্ষমতাসম্পন্ন এটি রাশিয়ার বৃহত্তম শোধনাগার এবং ইউক্রেন থেকে প্রায় ১,৫৫০ মাইল দূরে অবস্থিত। ইউক্রেনের স্পেশাল অপারেশনস ফোর্সেস দাবি করেছে, আঘাতের দূরত্ব ছিল আরও বেশি, ১,৮৬৫ মাইল। রাশিয়ার শীর্ষ দশটি শোধনাগারের মধ্যে এটি ছিল শেষ স্থাপনা, যেখানে এখন পর্যন্ত ড্রোন হামলা হয়নি। এই হামলা ইউক্রেনের দীর্ঘপাল্লার অভিযানের ধারাবাহিকতা, যা রাশিয়ার যুদ্ধযন্ত্রকে দুর্বল করার জন্য পরিকল্পিত। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ইউক্রেনীয় বাহিনী রুশ শোধনাগারগুলোতে অন্তত ১৯৪ বার আঘাত করেছে, যা গত বছরের তুলনায় এগারো গুণ বেশি। অভিযানের এই অভূতপূর্ব গতি রাশিয়ায় কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের জন্ম দিয়েছে, যার ফলে দেশটির অর্ধেকের বেশি অঞ্চল জ্বালানি বিক্রয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করতে বাধ্য হয়েছে এবং চালকদের পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কিয়েভের ক্রমবর্ধমান সাফল্যের পেছনে ড্রোন উৎপাদনে ব্যাপক বৃদ্ধি এবং মার্কিন গোয়েন্দা সহায়তার ভূমিকা রয়েছে, যা রুশ আকাশ প্রতিরক্ষা এড়ানোর জন্য কার্যকর ফ্লাইট পথ নির্ধারণে সহায়তা করে।

আঙ্কারায় জড়ো হওয়া ন্যাটো নেতারা ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ ও প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে আলোচনার মধ্যে একটি যৌথ ঘোষণা গ্রহণ করতে যাচ্ছেন, যেখানে ইউক্রেনের জন্য ১৪০ বিলিয়ন ইউরো (১৬০ বিলিয়ন ডলার) মূল্যের সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতিও অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, জেলেনস্কি ন্যাটোতে ইউক্রেনের সদস্যপদের পক্ষে জোরালো বক্তব্য দিয়েছেন। তার মতে, রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে উন্নত প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা গড়ে তোলা একটি দেশকে জোট থেকে বাদ দেওয়া ভুল হবে। তিনি জানান, তার দেশ প্রায় সব প্রয়োজনীয় অস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে এবং এখন কেবল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থেকে রক্ষায় মার্কিন প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার একটি ইউরোপীয় বিকল্প তৈরিতে সহায়তা প্রয়োজন।