হবিগঞ্জে ‘জুলাই পদযাত্রা’ চলাকালে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাদের গাড়িবহরে হামলা ও সংঘর্ষের প্রেক্ষাপটে সামাজিক মাধ্যমগুলোতে একাধিক ভুয়া ভিডিও ও ছবি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হতে দেখা গেছে। যাচাই-বাছাইয়ে উঠে এসেছে, এসব কন্টেন্টের সিংহভাগই হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘটনার, নয়তো প্রযুক্তির সাহায্যে বিকল্পিত।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ১৯ সেকেন্ডের ভিডিওতে দাবি করা হচ্ছিল, সেটি হবিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্যের বাসভবনে হামলার দৃশ্য। ফুটেজটিতে রাস্তায় পড়ে থাকা মোটরসাইকেল, পুলিশ ভ্যানে মানুষ তোলা এবং আহত ব্যক্তিদের অবস্থা দেখা যাচ্ছিল, আর ব্যাকগ্রাউন্ডে সাইরেনের শব্দ ছিল স্পষ্ট। কিন্তু ভিডিওটির কিফ্রেম রিভার্স ইমেজ সার্চের মাধ্যমে জানা যায়, এটি আসলে ২৮ জুলাই পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের একটি ঘটনার। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেখানে বিক্ষোভকারীদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে কমপক্ষে ২৫ জন নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। ‘জাগরণ নিউজ’ নামক একটি ফেসবুক পেজেও একই ভিডিও আজাদ কাশ্মীরের মিরপুরে পুলিশি গুলির ঘটনা হিসেবে প্রকাশিত হয়।
আরেকটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণায় ছড়ানো হয় এনসিপির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলমের একটি ছবি, যাতে দেখা যাচ্ছে তাঁর হাত ও পায়ে ব্যান্ডেজ করা, হাত গলায় জোলানো এবং ক্রাচে ভর করে দাঁড়িয়ে আছেন। দাবিটি ছিল, এটি হামলায় আহত হওয়ার পরের ছবি। তবে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত আসল ফটোগ্রাফ ও ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ভাইরাল ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড, পোশাক ও দাঁড়ানোর ভঙ্গি মূল ছবির মতো হলেও তাতে স্লিং, ব্যান্ডেজ ও ক্রাচ সংযোজন করা হয়েছে। প্রকৃত ভিডিওতে তাকে স্বাভাবিক ভাবেই হাঁটতে ও কথা বলতে শোনা যায়। এআইভিত্তিক ছবি বিশ্লেষণকারী টুল দ্বারাও ছবিটির সম্পাদিত হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
সামাজিক মাধ্যমের আরও একটি ভিডিওতে দাবি করা হয়েছিল, হবিগঞ্জের সহিংসতায় এক ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করেছেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, এই ভিডিওটি গত ১৭ জুনের একটি সম্পূর্ণ আলাদা ঘটনার। সেটি লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ এলাকায় ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া একাডেমির এক ছাত্রের মৃত্যুতে পরিবারের আহাজারির দৃশ্য। কোনো বিশ্বাসযোগ্য সংবাদমাধ্যম হবিগঞ্জের গতকালকের সংঘাতে প্রাণহানির বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
উল্লেখ্য, জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের স্মরণে এনসিপি সাড়া দেশে ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচি পালন করে আসছে। গত মঙ্গলবার হবিগঞ্জে এই অনুষ্ঠান শেষে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও সারজিস আলমের গাড়িবহরে আক্রমণ হয়, যার জন্য এনসিপি ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতা-কর্মীদের দায়ী করে। এই প্রেক্ষাপটে বুধবার এনসিপি ও হবিগঞ্জ বিএনপি-ছাত্রদল উভয়েই পাল্টাপাল্টি প্রতিবাদ কর্মসূচি ডাকার পর উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং স্থানীয় প্রশাসন সমস্ত ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হয়। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই বিভ্রান্তিকর কন্টেন্টগুলির ছড়াছড়ি পরিলক্ষিত হলো।




