বর্ষায় চারপাশের যোগাযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া নেত্রকোনার মদন উপজেলার চানগাঁও গ্রামের চকপাড়া থেকে যুক্তরাজ্যের শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিস্তৃত এক অসাধারণ পথচলার গল্প এটি। মো. শামসুল আলম, ডাকনাম সম্রাট—নামের সাথে তাঁর জীবনযাত্রার যেন অদ্ভুত মিল রয়েছে। একসময় যেখানে ছিল না বিদ্যুৎ, নেই আধুনিক নাগরিক সুবিধা, সেখান থেকে উঠে এসে তিনি এখন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব শেফিল্ডে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তবে তাঁর যাত্রা কিন্তু সহজ ছিল না।

১৯৯১ সালের ৩ জুন মাতুলালয় চানগাঁওয়ের চকপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন শামসুল। পৈতৃক নিবাস একই উপজেলার গোবিন্দশ্রী গ্রামে। হাওরবেষ্টিত দ্বীপসদৃশ এই গ্রামে বছরের ছয় মাস চলাচলের একমাত্র বাহন ছিল নৌকা। গোবিন্দশ্রী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার হাতেখড়ি। কখনো নৌকায়, কখনো পানিতে ভিজে স্কুলে যেতে হতো। পরিবারকে টানাপোড়েনের মধ্যে পড়তে হয় টানা কয়েক বছর বোরো ফসল নষ্ট হওয়ায়। তবুও সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য কঠোর সংকল্প ছিল ব্যবসায়ী মো. হারুন অর রশিদ ও গৃহিণী মমতা আক্তারের। দুই সন্তানের মধ্যে বড় শামসুলকে নিয়ে তারা চলে আসেন উপজেলা সদরে, মাতুলালয়ের কাছাকাছি।

জাহাঙ্গীরপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শেষ করে ভর্তি হন জাহাঙ্গীরপুর টি আমিন পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ে। ২০০৭ সালে সেখান থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসিতে পান ৪.৩৮ জিপিএ। এরপর ২০০৯ সালে নেত্রকোনা সরকারি কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এইচএসসি পাস করেন। কলেজের প্রায় সব পরীক্ষায় প্রথম হওয়া শামসুলের লক্ষ্য তখন স্পষ্ট—প্রকৌশলী হওয়া। সেই লক্ষ্যেই ভর্তি হন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট)। ২০১৪ সালে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি গবেষণা, প্রযুক্তি ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন তিনি। চুয়েট সাংবাদিক সমিতির সভাপতি, গবেষণাধর্মী সংগঠন অ্যান্ড্রোমিডা স্পেস অ্যান্ড রোবোটিকস রিসার্চ অর্গানাইজেশনের (আসরো) সহপ্রতিষ্ঠাতা ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ সমিতির প্রেস সেক্রেটারির দায়িত্বও পালন করেছেন। সহপাঠীদের সঙ্গে তৈরি করেছিলেন বাংলা ভাষায় পরিচালিত রোবট, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত বৈদ্যুতিক ফ্যান ও বাতি, ডিজিটাল থার্মোমিটার, ফ্লুইড ভেলোসিটি মিটার এবং পরিবেশ পর্যবেক্ষণকারী রোবট। ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ‘ডিজিটাল আইটি মেলায়’ তাঁদের প্রকল্পের স্টল প্রথম স্থান দখল করে। ২০১৪ সালে তৈরি করা বাংলা ভাষায় চলাচলকারী উদ্ধারকারী বাই পেডাল রোবটটি প্রথম আলোয় প্রকাশিতও হয়েছিল।

স্নাতক শেষে অনেক সহপাঠী বিদেশে পাড়ি জমানোর পথ বেছে নিলেও শামসুল আলম সিদ্ধান্ত নেন ভিন্ন। নিজের শেখা জ্ঞান দেশের কাজে লাগাতে চান। পরে কয়েকটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন। ২০১৯ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডে এক্সিকিউটিভ ট্রেইনি হিসেবে যোগ দেন, যা সহকারী ব্যবস্থাপকের সমতুল্য। সেখানে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সাইট ইঞ্জিনিয়ারের দায়িত্ব পান। ২০২০ সালে কাজের সূত্রে জুনিয়র স্পেশালিস্ট হিসেবে পাঠানো হয় রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে। সেখানে রূপপুর প্রকল্পের যন্ত্রপাতির উৎপাদন ও মান পর্যবেক্ষণের কাজ করেন। কাজ করেছেন রোসাটম, আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থাসহ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে। বিদেশে থাকাকালীনই শোনেন ৩৮তম বিসিএসের ফলাফল—সুপারিশপ্রাপ্ত হন গণপূর্ত ক্যাডারে। রূপপুর প্রকল্পের নানা অসংগতি নিয়ে ম্যানেজমেন্টকে অবহিত করতে গিয়ে একাধিকবার ভর্ৎসনাও পেয়েছেন। ২০২১ সালে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে গণপূর্তে যোগ দেন। পরে পিরোজপুর ও পটুয়াখালীতে উপবিভাগীয় প্রকৌশলীর অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করেন।

কাজের পাশাপাশি উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি চালিয়ে যান। স্ত্রীর অনুপ্রেরণায় ২০২৪ সালে পান বড় সাফল্য—একই বছরে তিনটি বৃত্তি। যুক্তরাজ্যের কমনওয়েলথ স্কলারশিপ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইরাসমাস মুন্ডাস স্কলারশিপ এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ফেলোশিপ। তিনটির মধ্যে বেছে নেন কমনওয়েলথ স্কলারশিপ। ইউনিভার্সিটি অব শেফিল্ডে ইলেকট্রনিকস ও তড়িৎ কৌশল বিষয়ে স্নাতকোত্তর প্রোগ্রামে ভর্তি হয়ে সম্প্রতি মাস্টার অব সায়েন্স ইন ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল সৌরবিদ্যুৎকে বৈদ্যুতিক গ্রিডে যুক্ত করার উপযোগী ইনভার্টার তৈরি—নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। যুক্তরাজ্য সরকারের গবেষণা তহবিলের অধীনে ইউনিভার্সিটি অব ইয়র্ক এবং জয়েন্ট নেচার কনসারভেশন কমিটির যৌথ প্রকল্পে এক্সিলেন্ট সিটিজেন সায়েন্টিস্ট হিসেবে স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি। এছাড়া প্রকৌশল ও প্রযুক্তি নিয়ে ইউটিউবে ‘টেকটক’ নামে একটি অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন।

শামসুল আলম জানান, জীবনের প্রতিটি বাঁকে অনেকেই তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘মা–বাবার দোয়া, ত্যাগ ও সহযোগিতা না থাকলে হয়তো প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা বা বিসিএস ক্যাডার হিসেবে কাজ করার সুযোগ হতো না।’ তাঁর স্ত্রী রোকসানা ফিরদাউস নিগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক, বর্তমানে যুক্তরাজ্যের লিডসে পিএইচডি করছেন। ‘স্ত্রীর পরামর্শ, সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণাই উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব করেছে,’ বলেন তিনি। ক্যারিয়ার নির্বাচনে তাঁর মামা প্রকৌশলী মো. আনোয়ারুল আমিন ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক প্রকৌশলী মো. জসিম উদ্দিনের ভূমিকাও স্মরণ করেছেন। শিক্ষক অধ্যাপক কাজী দেলোয়ার হোসেন ও অধ্যাপক মোহাম্মদ আহসান উল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন সুপারিশপত্র দেওয়ার জন্য।

বিদেশে অনেক সম্ভাবনা থাকলেও শামসুল আলমের ভাবনায় বাংলাদেশই বড় জায়গা দখল করে আছে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেশের অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কাজে লাগাতে চান। বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গ্রিন বিল্ডিং ও টেকসই অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করার আগ্রহ তাঁর। তবে কর্মজীবনের কিছু হতাশার কথাও জানান তিনি। বলেন, ‘বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারে যোগদান করে আমি যাঁদের জুনিয়র হিসেবে পেয়েছি, তাঁরা ডাবল পদোন্নতি পেয়ে আমার বস হয়ে গেছেন; অথচ পদোন্নতির সব যোগ্যতা ও পদ ফাঁকা থাকা সত্ত্বেও আমাদের ব্যাচের পদোন্নতি হচ্ছে না।’ তাঁর মতে, যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন পেলে কর্মীদের আগ্রহ ও দায়িত্ববোধ বাড়ে। হাওরের সেই প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু হওয়া এই গল্পের শেষ এখনো হয়নি। সুযোগের সীমাবদ্ধতা, প্রতিকূলতা ও অনিশ্চয়তা পেরিয়ে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন—পরিস্থিতি পথ কঠিন করতে পারে, কিন্তু স্বপ্নকে থামিয়ে দিতে পারে না।