বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) বিসিএস ভাইভায় এবার থেকে প্রথাগত প্রশ্নের ধারা বদলে যাচ্ছে। কণ্ঠস্থ তথ্য বা মুখস্থ করা জবাব দিয়ে আর বোর্ডকে সন্তুষ্ট করা যাবে না বলে জানা যাচ্ছে। বরং প্রার্থীকে তাঁর নিজের বাস্তব জীবনের কাজের অভিজ্ঞতা দিয়ে দক্ষতা প্রমাণ করতে হবে। তবে বোর্ডে অল্প সময়ে কীভাবে সুসংগঠিতভাবে সেই অভিজ্ঞতার গল্প তুলে ধরা যায়, তা নিয়ে অনেক প্রার্থীই বিভ্রান্তিতে পড়েন। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি কৌশল হলো ‘স্টার’ (STAR) মেথড, যা চারটি ধাপে যেকোনো বাস্তব ঘটনাকে উপস্থাপন করার একটি কাঠামো দেয়।

‘STAR’ শব্দটি চারটি ইংরেজি শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ: S অর্থাৎ সিচুয়েশন (পরিস্থিতি), T অর্থাৎ টাস্ক (দায়িত্ব), A অর্থাৎ অ্যাকশন (পদক্ষেপ) এবং R অর্থাৎ রেজাল্ট (ফলাফল)। প্রথম ধাপে ঘটনার সময়, স্থান ও প্রেক্ষাপট সংক্ষেপে বলা হয়। দ্বিতীয় ধাপে সেই পরিস্থিতিতে প্রার্থীর উপর ন্যস্ত মূল দায়িত্ব বা চ্যালেঞ্জটি চিহ্নিত করতে হয়। তৃতীয় ধাপে প্রার্থী ব্যক্তিগতভাবে কী কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তা বিস্তারিত বলতে হয়। আর চতুর্থ ধাপে সেই পদক্ষেপের ফলে কী ইতিবাচক ফলাফল এসেছিল, তা উল্লেখ করতে হয়।

এই পদ্ধতি কীভাবে কাজ করে, তা বোঝাতে একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ধরুন, ভাইভা বোর্ডে প্রশ্ন করা হলো, ‘জীবনের এমন একটি ঘটনা বলুন যেখানে বিরূপ পরিস্থিতিতে দ্রুত সমস্যার সমাধান করতে হয়েছিল।’ জবাবে একজন প্রার্থী বলতে পারেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন একটি জাতীয় সেমিনারের আয়োজন করছিলেন তিনি। অনুষ্ঠান শুরুর মাত্র ত্রিশ মিনিট আগে তাঁরা জানতে পারেন, আমন্ত্রিত মূল বক্তা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। সেক্ষেত্রে তাঁর দায়িত্ব ছিল দ্রুত বিকল্প একজন উপযুক্ত বক্তা খুঁজে বের করা এবং দর্শকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে না দেওয়া। প্রার্থী বিচলিত না হয়ে সঙ্গে সঙ্গে বিভাগের একজন সিনিয়র প্রফেসরের সাথে যোগাযোগ করেন, যিনি বিষয়টির বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তাঁকে পরিস্থিতি বোঝানোর পর তিনি মঞ্চে আসতে রাজি হন। পাশাপাশি সহকর্মীদের অনুরোধ করে মূল আলোচনার সময়সূচি কিছুটা পিছিয়ে নেওয়া হয়। সবশেষে সেমিনারটি সফলভাবে সম্পন্ন হয় এবং দর্শক বা অতিথিরা কোনো বিঘ্নই টের পাননি। দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ায় অনুষ্ঠানের মান অক্ষুণ্ণ ছিল।

নতুন এই পদ্ধতিতে কোচিং সেন্টারের তৈরি রেডিমেড উত্তর বা শিট মুখস্থ করার প্রবণতা আর কাজে আসবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বাণিজ্যিকভাবে তৈরি কৃত্রিম গল্প বলতে গেলে বোর্ডের কাউন্টার প্রশ্নে প্রার্থী ধরা পড়বেন। কারণ, উত্তরের প্রতিটি তথ্য সম্পর্কে গভীর অনুপ্রশ্ন করা হবে, যা প্রার্থীর নিজস্ব অভিজ্ঞতা ছাড়া সামলানো অসম্ভব। তাই মুখস্থ নোটের বদলে নিজের জীবনের সত্যিকারের ঘটনা নিয়ে প্রস্তুতি নেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি।

এজন্য প্রার্থীদের এখন থেকেই একটি নোটবুক তৈরি করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন, ক্লাব বা সংগঠনের কাজ, পার্টটাইম চাকরি, ইভেন্ট পরিচালনা, স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ড বা পারিবারিক জীবন থেকে অন্তত দশ থেকে বারোটি সত্য ঘটনা লিখে রাখা যেতে পারে। ঘটনাগুলোকে নেতৃত্ব, দলগত কাজ, সময় ব্যবস্থাপনা এবং যোগাযোগ দক্ষতার মতো সক্ষমতা অনুযায়ী ভাগ করে ‘স্টার’ ফরম্যাটে সাজিয়ে রাখা উচিত। বোর্ডে গিয়ে মুখস্থ বলা নোটের চেয়ে নিজের জীবনের একটি ছোট্ট কিন্তু সত্য ঘটনা আত্মবিশ্বাসের সাথে বলতে পারাই সাফল্যের চাবিকাঠি।