কানাডায় গাড়ি চুরি একটি ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মন্ট্রিয়ল ও টরন্টো শহরসহ সারাদেশে প্রতিদিন গড়ে ১৩০টি গাড়ি চুরি হচ্ছে। চুরির ঘটনাগুলো আর বিচ্ছিন্ন নয়; বরং সংগঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, শুধু মন্ট্রিয়লের লাসাল এলাকায় গড়ে প্রতিদিন অন্তত একটি গাড়ি চুরি হয়। কানাডার নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মতে, এই অপরাধ অর্থ পাচার ও সহিংসতার সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
চুরির কৌশলেও এসেছে পরিবর্তন। চোরেরা এখন কি-ফব সিগন্যাল কপি, রিলে আক্রমণ, গাড়ির সফটওয়্যার হ্যাকিং এবং ডায়াগনস্টিক পোর্টের মাধ্যমে নতুন চাবি প্রোগ্রাম করার মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই গাড়ি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। নতুন মডেলের এসইউবি, পিকআপ ট্রাক ও বিলাসবহুল গাড়ি সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। ইকুইট অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি চুরি হওয়া গাড়ির তালিকায় রয়েছে টয়োটা র্যাভ ৪, ডজ র্যাম ১৫০০, হোন্ডা সিআর-ভি, ফোর্ড এফ ১৫০, হোন্ডা সিভিক, জিপ র্যাংলার, শেভ্রোলেট সিলভেরাডো/জিএমসি সিয়েরা ১৫০০, টয়োটা হাইল্যান্ডার, টয়োটা টুন্ড্রা ও লেক্সাস আরএক্স সিরিজ। আন্তর্জাতিক বাজারে এগুলোর পুনর্বিক্রয় মূল্য বেশি এবং আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে চাহিদা বেশি থাকায় এগুলো টার্গেট হচ্ছে।
চুরি হওয়া গাড়ির একটি বড় অংশ বিদেশে পাচার হয়ে যায়। টরন্টো প্রধান চুরির এলাকা হলেও মন্ট্রিয়ল বন্দর পাচারের প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পোর্ট অব মন্ট্রিয়ল পূর্ব কানাডার সবচেয়ে বড় কনটেইনার বন্দর, যেখান থেকে ইউরোপ, পশ্চিম আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে নিয়মিত জাহাজ চলাচল করে। ২০২৪ সালের 'প্রজেক্ট ভেক্টর' অভিযানে শত শত কনটেইনার তল্লাশি করে ৫৯৮টি চুরি হওয়া গাড়ি উদ্ধার করা হয়, যার অধিকাংশই অন্টারিও থেকে চুরি হয়েছিল। এছাড়া পোর্ট অব হ্যালিফ্যাক্স থেকেও কিছু চালান শনাক্ত হয়েছে।
গাড়ি চুরি রোধে ২০২৪ সালে ফেডারেল সরকার 'ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান অন কমব্যাটিং অটো থেফট' চালু করে। এর আওতায় সীমান্তে কনটেইনার তল্লাশি বৃদ্ধি, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার যৌথ অভিযান, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, বন্দর নজরদারি জোরদার এবং গাড়ি নির্মাতাদের নিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে জাতীয়ভাবে গাড়ি চুরি প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত যৌথ অভিযানে প্রায় তিন হাজার চুরি হওয়া গাড়ি উদ্ধার করা হয়েছে। সীমান্ত সংস্থা ২০২৪ সালে ২ হাজার ২৭৭টি এবং ২০২৫ সালের প্রথম পাঁচ মাসে আরও ৬৬৬টি চুরি হওয়া গাড়ি আটক করে। বিমা খাতের তথ্যমতে, অন্টারিওতে গাড়ি চুরি প্রায় ২২ শতাংশ এবং কুইবেকে ২৫ শতাংশ কমেছে। তবে এখনো প্রায় অর্ধেক চুরি হওয়া গাড়ি উদ্ধার করা যায়নি, যা ইঙ্গিত দেয় অনেক গাড়িই বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে অথবা বিচ্ছিন্ন করে বিক্রি করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধ চক্র এখনো সক্রিয় এবং প্রযুক্তিনির্ভর চুরির কৌশল আরও উন্নত হচ্ছে। কানাডার ক্রিমিনাল ইন্টিলিজেন্স সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, শুধু অন্টারিও ও কুইবেকেই অন্তত ৬৩টি সংগঠিত অপরাধ চক্র গাড়ি চুরি ও পাচারের সঙ্গে জড়িত বলে শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া চলতি বছরে এই দুর্নীতি তদন্তে বর্তমান ও সাবেক আটজন টরন্টো পুলিশ কর্মকর্তা গ্রেপ্তার হন, যাদের বিরুদ্ধে ঘুষ, বিচারপ্রক্রিয়ায় বাধা ও গোপন তথ্য ফাঁসের অভিযোগ রয়েছে।
গাড়ি চুরির ফলে মালিকদের আর্থিক ক্ষতি, বিমা প্রিমিয়াম বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। বিমা কোম্পানিগুলোর যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে প্রায় ৪৭ হাজার গাড়ি চুরি হয় এবং বিমা খাতে ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৯০০ মিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার। বিশেষজ্ঞ মেকানিক্যাল প্রকৌশলীরা গাড়িমালিকদের অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা হিসেবে অনুমোদিত ইমোবিলাইজার, ট্যাগ ট্যাকিং সিস্টেম এবং রিয়েল-টাইম অবস্থান ট্র্যাক করার ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। সরকার জানিয়েছে, লক্ষ্য শুধু চোর ধরা নয়, বরং গোটা আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রের অর্থায়ন ও রপ্তানি নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া। তবে নাগরিকেরা আশা করছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি অচিরেই আসবে।


