প্রযুক্তি যখন ইন্দ্রিয়কে আচ্ছন্ন করছে, তখন মানুষের অনন্য গুণাবলি ও ধীরস্থির সৃজনশীলতার পক্ষে মত দিয়েছেন এডওয়ার্ড এনিনফুল। যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার এআই বিপ্লবকে শিল্প বিপ্লবের মতোই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। কিন্তু নিছক ‘মানুষকে ব্যবস্থার অংশ রাখা’র চেয়ে ‘মানুষকে নেতৃত্বে রাখার’ তাগিদ দিয়েছেন এনিনফুল। নৈতিকতা, অন্তর্দৃষ্টি, সহানুভূতি ও আবেগ—এই গুণগুলো কেবল মানুষেরই, আর এআই বিস্তারের যুগে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
ব্রিটিশ ভোগের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ সম্পাদক হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করা এনিনফুল তাঁর বোন আকুয়ার সঙ্গে সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে যাত্রা শুরু করেছেন একটি নতুন গণমাধ্যম ও বিনোদন সংস্থা, ইই৭২-এর। এই যুগে যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি অসংখ্য কনটেন্টে সবকিছু ভরে উঠেছে,তখন এনিনফুলের দাবি পরিষ্কার—ইই৭২-এর সবকিছুই সৃষ্টি করবে মানুষ। তাঁর ভাষায়, ‘আমি ধীর ডিজিটালে বিশ্বাসী। আমরা যা কিছু করি, সবই অত্যন্ত যত্নসহকারে বাছাই করা। আমরা কোলাহলের অংশ নই; মানুষ এই কোলাহলে বিরক্ত।’
কান চলচ্চিত্র উৎসবে ফরচুনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি প্রশ্ন তোলেন, তীব্র ডিজিটাল ও এআই নির্ভর এক পৃথিবীতে সৃজনশীলতা দিয়ে কীভাবে সেই কোলাহলকে ভেদ করা যায়। সিনিয়র কর্পোরেট নেতৃত্ব যখন তথ্যের আধিক্যে দিশেহারা, এনিনফুল জানালেন, প্রতিদিন তাঁদের প্ল্যাটফর্মে হয়তো একটি মাত্র জিনিস প্রকাশিত হয়, কখনও তিনটি। কিন্তু অবিরাম তথ্যযুদ্ধে নামার কোনও ইচ্ছা নেই তাঁর। নীরবতা এখন মূল্যবান একটি পণ্য, ঠিক যেভাবে বুকটক তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস ফিরিয়ে আনছে, সেভাবেই পত্রিকারও নবজাগরণ ঘটছে।
মজার বিষয় হলো, এনিনফুল ইই৭২-কে ম্যাগাজিন ব্যবসা বলতে চান না। এটি কোনো বিজ্ঞাপনও নেয় না। তিনি বলেছেন, একটি নতুন ও অধিক জৈবিক ব্যবসায়িক কাঠামো তারা বের করেছেন, যেখানে ইভেন্ট অথবা সহযোগিতার মাধ্যমেই ক্লায়েন্টদের সঙ্গে কাজ হয়। এর ফলে যে পত্রিকাটি বেরোয়, তা শুধুই সৃজনশীলতা উপভোগের জন্য। রিহান্না ও কেট মসের মতো তারকারা হয়েছেন প্রচ্ছদে, দক্ষিণ আফ্রিকার স্কেটবোর্ডার বা ক্রিস্টি’র নিলামকারীদের জগত—দীর্ঘ গল্প, ফটোগ্রাফি, শিল্প আর সংস্কৃতির বিচিত্র মিশেল থাকে এতে। রিহান্না-প্রচ্ছদের সাম্প্রতিক সংস্করণ অনলাইনে সোল্ড আউট, যা প্রমাণ করে অ্যালগরিদমও সততা ও নতুন ধারণার সন্ধান করে।
এনিনফুল মনে করেন, মানব-নির্মিত আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরস্পর বিরোধী নয়। কানেই একজন প্রযুক্তি নেতা বলেছিলেন, বিদ্যুৎকে যেমন উপেক্ষা করা যায় না, তেমনই এআইকেও নয়। কিন্তু যখন ঠিক মনে হয়, তখন বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়া যায়; প্রাকৃতিক আলোও প্রায়শই একাই যথেষ্ট কাজ দেয়। গুগল ও মোঁক্লেরের মতো ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করলেও মূল চালিকা শক্তি সবসময় মানুষ। গুগলের এআই-চালিত ভার্চুয়াল পোশাক পরার সরঞ্জামকে তারা নিউ ইয়র্ক ফ্যাশন উয়িকের অভিজ্ঞতা বর্ধনে ব্যবহার করেছিল, যা ফ্যাশনকে গণমুখী করতে সাহায্য করে। কিন্তু এটি কখনোই মানব-নেতৃত্বাধীন অভিজ্ঞতার বদলে বসার বস্তু নয়।
প্রসঙ্গত, কেট মসের একটি প্রচ্ছদের ফটোগ্রাফি নিক নাইট এআই দিয়ে অ্যানিমেট করেছিলেন, যা লন্ডনের পিকাডিলি সার্কাসে প্রদর্শিত হয়। এনিনফুলের মতে, এআই একটা যন্ত্রমাত্র। সম্পাদনা বা পরিবর্ধনের কাজে লাগানো গেলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা মানুষকেই নিতে হবে। চূড়ান্ত কথা বলার জন্য একজন সম্পাদকের প্রয়োজন অনিবার্য। মানুষ স্পষ্টতই সত্য ও সততা চায়, এমন কিছু যা কোলাহল ভেদ করে আসে, কারণ এই কোলাহলপ্রবণ জগতে প্রকৃত এবং সৎ কিছু নজর কাড়ে।



