বাংলাদেশের সংগীত ও ফ্যাশন জগতে নতুন মাত্রা যোগ করতে যাচ্ছে একটি ব্যতিক্রমী আয়োজন। আগামী ৩১ জুলাই ঢাকার বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে মঞ্চস্থ হবে ‘প্লেলিস্ট: ট্রিবিউট টু অরিজিনস—মাইকেল জ্যাকসন X ওয়ারফেজ’। এটি কেবল একটি সাধারণ কনসার্ট নয়; বরং বিশ্ব পপ সংস্কৃতির অন্যতম আইকন মাইকেল জ্যাকসনের উত্তরাধিকার এবং বাংলাদেশের চার দশকের পুরনো রক ব্যান্ড ওয়ারফেজের সঙ্গীতযাত্রার এক অনন্য মেলবন্ধন। আয়োজক প্রতিষ্ঠান ব্র্যান্ডমিথ কমিউনিকেশনসের হেড অব বিজনেস রাকিবুল আজম জানান, সাম্প্রতিক সময়ে মাইকেল জ্যাকসনকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তাঁর জীবনভিত্তিক চলচ্চিত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন প্রজন্মের আলোচনা এই উদ্যোগের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। তবে আয়োজকরা চেয়েছিলেন আর দশটি ট্রিবিউট শোর মতো কিছু নয়; বরং এমন একটি অভিজ্ঞতা নির্মাণ করতে চেয়েছেন যেখানে দর্শক শুধু গান শুনবেন না, অনুভব করবেন একজন শিল্পীর মঞ্চজাদু ও নান্দনিকতা। সেই লক্ষ্যে দীর্ঘ পরিকল্পনার পর প্রস্তুত করা হয়েছে মঞ্চ। বিশাল এলইডি ওয়াল, সিনেম্যাটিক ভিজ্যুয়াল, অত্যাধুনিক লাইটিং ও বিশেষ ইফেক্টের মাধ্যমে প্রতিটি গান হয়ে উঠবে একটি দৃশ্য। প্রায় দুই ঘণ্টাজুড়ে পরিবেশিত হবে মাইকেল জ্যাকসনের ১৫টি কালজয়ী গান। এরপর এক ঘণ্টার ওয়ারফেজের নিজস্ব পরিবেশনা থাকবে। পুরো কনসার্টটি মাল্টিক্যামেরা সিনেম্যাটিক প্রযুক্তিতে ধারণ করা হবে এবং পরে মিউজিক্যাল ফিল্ম ও লাইভ অডিও অ্যালবাম হিসেবে প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে।
ওয়ারফেজের ভোকাল পলাশ নূর জানান, বাইরে থেকে মাইকেলের গান যতটা সহজ মনে হয়, আসলে তা পরিবেশন করতে গেলে প্রতিটি লাইনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সূক্ষ্ম সংগীতচর্চা বোঝা যায়। তাঁদের লক্ষ্য অনুকরণ নয়, বরং সৃষ্টিকে সম্মান জানানো। মাইকেলের গানকে ওয়ারফেজের নিজস্ব রক ঘরানায় নতুনভাবে তুলে ধরাই উদ্দেশ্য। পলাশের মতে, ‘মাইকেল জ্যাকসন প্রতিদিনই আমাকে কিছু না কিছু শেখান। তাঁর পুরো ক্যারিয়ার একজন সংগীতশিল্পীর জন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়।’ সম্প্রতি একুশে পদকে ভূষিত হওয়া ওয়ারফেজের দর্শকের প্রত্যাশা আরও বেড়েছে বলে মন্তব্য করেন পলাশ।
ব্যান্ডের গিটারিস্ট সৌমেন দাস হাসতে হাসতে বলেন, স্কুলজীবনে তিনি মুনওয়াক শেখার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বুঝেছেন, মাইকেলের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর সৃজনশীলতার গভীরতা। একজন শিল্পী যখন সৃষ্টি করতে করতে সময়ের হিসাব ভুলে যান, সেই ‘ফ্লো স্টেট’ তাঁকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করে। ওয়ারফেজের ড্রামার ও দলনেতা শেখ মনিরুল আলম টিপু মনে করেন, একজন পারফরমারের পোশাকও তার শিল্পভাষার অংশ। ‘দর্শক শুধু গান শুনতে আসে না, তারা শিল্পীকেও দেখতে আসে। তাই পোশাক, স্টাইল আর উপস্থাপনা—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ।’ এই কনসার্টে ব্যান্ডের নিজস্ব পরিচয় অক্ষুণ্ন রেখেই মাইকেল জ্যাকসনের আইকনিক স্টেজ লুকের আবহ তুলে ধরা হবে কস্টিউমে।
মাইকেল জ্যাকসনের ফ্যাশনের প্রভাব নিয়ে কথা বলেন সংগীতশিল্পী ও ফিটনেস মডেল ওয়াহিদা হুসেন। তাঁর মতে, মাইকেল জ্যাকসনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর মৌলিকতা। তিনি কাউকে অনুসরণ করেননি; বরং নিজেই তৈরি করেছিলেন নতুন এক ভিজ্যুয়াল ভাষা। প্রতিটি পোশাক ছিল একটি বক্তব্য। সেই ভিজ্যুয়াল উত্তরাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই এই কনসার্টের অফিশিয়াল কস্টিউম তৈরি করেছে দেশের শীর্ষ সারির ব্র্যান্ড টুয়েলভ ক্লোদিং। প্রতিষ্ঠানের ডেপুটি ম্যানেজার (ডিজাইন) শুভাগত ভট্টাচার্য্য শুভ জানান, ডিজাইন টিম আশি ও নব্বইয়ের দশকে মাইকেল জ্যাকসনের বিশ্বভ্রমণ, বিখ্যাত কনসার্ট এবং সিগনেচার স্টাইল নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা করেছে। উদ্দেশ্য ছিল হুবহু নকল না করে মাইকেলের মঞ্চ-উপস্থিতি ও ব্যক্তিত্বকে সমকালীন ভাষায় নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা। অনেক উপকরণ আর সহজে না পাওয়ায় সেগুলো নতুন করে তৈরি করতে হয়েছে। প্রতিটি পোশাকের কাট, সিলুয়েট ও অলংকরণ এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে যাতে মাইকেলের আবহ অক্ষুণ্ন থাকে এবং শিল্পীরা মঞ্চে স্বাচ্ছন্দ্যে পারফর্ম করতে পারেন।
এই আয়োজনের টাইটেল স্পনসর সুজুকি বাংলাদেশ–র্যানকন মোটরবাইকস লিমিটেড। মজার বিষয় হলো, আশির দশকের শুরুতে মাইকেল জ্যাকসন নিজেও সুজুকির ‘লাভ ইজ মাই মেসেজ’ প্রচারণায় যুক্ত ছিলেন। জনপ্রিয় CL50 Love স্কুটারকে ঘিরে নির্মিত সেই প্রচারণা পপ সংস্কৃতির স্মরণীয় অধ্যায়। চার দশক পর সেই ঐতিহাসিক সংযোগ যেন নতুন অর্থে ফিরে আসছে বাংলাদেশের মঞ্চে। ‘প্লেলিস্ট: ট্রিবিউট টু অরিজিনস—মাইকেল জ্যাকসন X ওয়ারফেজ’ বাংলাদেশের কনসার্ট ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে আশা আয়োজকদের। আলো নিভলেও কিংবদন্তিরা হারিয়ে যান না—তাঁরা ফিরে আসেন নতুন প্রজন্মের অনুভবে, নতুন মঞ্চের আলোয়।




