নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে নিখোঁজ হওয়া এক ব্যবসায়ীর মরদেহ তিন মাস পর সিমেন্টে ঢালাই করা একটি ড্রামের ভেতর থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন নিহতের দূরসম্পর্কের ভাগনে রফিকুল ইসলাম ওরফে সবুজ। ব্যবসায়িক বিরোধ ও পারিবারিক কলহের জের ধরে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে তদন্তকারীরা নিশ্চিত হয়েছেন।
২০২০ সালের ৪ এপ্রিল নিজ বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হন মোটর পার্টসের ব্যবসায়ী হেকমত আলী। তাঁর স্ত্রী রোকসানা বেগম ১৪ এপ্রিল রূপগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। স্থানীয় পুলিশ তদন্তে ব্যর্থ হলে ১৫ জুন মামলাটির দায়িত্ব পায় পিবিআই। তদন্তের শুরুতে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয় হেকমতের ভাগনে রফিকুলকে। তাঁকে দুই দফা রিমান্ডে নিয়েও কোনো সুরাহা না পেয়ে নতুন করে তদন্ত শুরু করে পিবিআই।
তদন্তকারীরা জানতে পারেন, নিখোঁজের রাতেই রফিকুল এক নছিমনচালকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করেছিলেন। সেই চালককে খুঁজে বের করার পর প্রথমবারের মতো প্রকাশ পায় একটি ভারী ড্রামের গল্প। চালক মো. শান্ত মিয়া জানান, ৫ এপ্রিল ভোরে রফিকুলের বাড়িতে গিয়ে তিনি দেখেন একটি বড় ড্রাম নিয়ে অপেক্ষা করছেন রফিকুল, তাঁর দুই ভাই ও বাবা। চারজন মিলে ড্রামটি নছিমনে তোলেন এবং কিছু দূর যাওয়ার পর কুশাবো-লিচু ফ্যাক্টরির কাছে একটি মাছের ঘেরের পাশে নামিয়ে দেওয়া হয়। এরপর শান্ত মিয়াকে বিদায় করে দেওয়া হয়।
এই তথ্যের ভিত্তিতে রফিকুলকে পুনরায় রিমান্ডে নেওয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি হত্যাকাণ্ডের স্বীকারোক্তি দেন। তাঁর দেখানো জায়গায় পিবিআই ডুবুরি নামিয়ে পুকুরের তলা থেকে ড্রামটি উদ্ধার করে। ড্রামটি কেটে খোলার পর ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে হেকমতের মরদেহ। তদন্তে উঠে আসে, হেকমতকে হত্যার পর মরদেহ যাতে ভেসে না ওঠে এবং দীর্ঘদিন কারও নজরে না আসে, সেজন্যই ড্রামের ভেতরে রেখে সিমেন্ট দিয়ে ঢালাই করা হয়েছিল।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, ৩ এপ্রিল রাতে রফিকুল হেকমতকে ফোন করে বিয়ের জন্য পাত্রী দেখানোর কথা বলে পরদিন বাড়িতে আসতে বলেন। ৪ এপ্রিল সকালে হেকমত রফিকুলদের বাড়িতে যান। দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর তাঁকে একটি কক্ষে বিশ্রাম নিতে বলা হয়। একপর্যায়ে ঘুমিয়ে পড়লে গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় তাঁকে। এরপর মরদেহ একটি খালি ড্রামে ভরে সিমেন্ট দিয়ে মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাড়িতে নির্মাণকাজের জন্য সিমেন্ট মজুত ছিল বলেই এই পদ্ধতি বেছে নেওয়া হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, হেকমতের ব্যবসায় একসময় অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন রফিকুল। কিন্তু লাভের অংশ, ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ এবং পারিবারিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দুজনের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। বিয়ের কয়েকটি প্রস্তাব ভেঙে যাওয়ার জন্যও হেকমতকে দায়ী করতেন রফিকুল। এই বিরোধের জের ধরেই পরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ড চালানো হয়। রফিকুলের দুই ভাই মাহফুজুর রহমান ও মামুন এবং তাঁদের বাবা ইয়াকুব হোসেনও এই পরিকল্পনায় যুক্ত ছিলেন বলে তদন্তে উঠে আসে।
পিবিআই প্রধান ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল জানান, অপরাধীরা মনে করেছিলেন মরদেহ গুম করে হত্যার সব চিহ্ন মুছে ফেলা যাবে। কিন্তু মুঠোফোনের তথ্য, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও নিবিড় তদন্তের মাধ্যমে মরদেহ উদ্ধার থেকে শুরু করে হত্যার পুরো পরিকল্পনাই উদঘাটন করা সম্ভব হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে আদালত এ মামলার রায় দিয়েছে। রায়ে রফিকুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড এবং তাঁর ভাই মাহফুজুর রহমানকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।




