কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার মেহেরনামা বাজারপাড়ায় ওয়াসিমদের পাকা একতলা বাড়িটি এখনো বন্যার পানিতে ঘেরা। মঙ্গলবার বিকেলে পানি মাড়িয়ে বাড়িতে পৌঁছালে ড্রয়িংরুমের টেবিলে সাজানো ১৮-২০টি ক্রেস্টের দিকে ইশারা করে ওয়াসিমের মা জোসনা বেগম বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা তাঁর বীরত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এসব ক্রেস্ট দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আজকাল ছেলের কথা খুব বেশি মনে পড়ে। ২০২৩ সালেও বন্যা হয়েছিল, তখন ছেলে কলে থেকে ছুটে এসে পানি মাড়িয়ে বাজার-সদাই থেকে শুরু করে সবকিছু করেছে। এবার সে নেই।’ এরপর তিনি ক্রেস্টগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখাতে থাকেন।

ওয়াসিম চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ও চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। দুই ভাই তিন বোনের মধ্যে দ্বিতীয় ছিলেন তিনি। ২০১৭ সালে পেকুয়ার মেহেরনামা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও ২০১৯ সালে বাকলিয়া সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে চট্টগ্রাম কলেজে সমাজবিজ্ঞানে অনার্সে ভর্তি হন। মৃত্যুকালে তিনি তৃতীয় বর্ষের ফলপ্রত্যাশী ছিলেন।

জোসনা বেগম বলেন, চট্টগ্রাম থেকে কেউ একজন ফোন করে জানিয়েছে ১৬ জুলাই ওয়াসিমের শাহাদাতবরণ উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁকে ও তাঁর স্বামীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সেই ফোনের পর থেকেই ছেলের কথা বেশি করে মনে পড়ছে, তাই ক্রেস্টগুলো হাতে ছুঁয়ে দেখছেন তিনি। তবে ছেলের ছবি দেখলেই ভেতরটা মুচড়ে ওঠে, সবকিছু শূন্য মনে হয়। রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেন না তিনি—বারবার ঘুম ভেঙে যায়, জেগে উঠে মনে হয় ওয়াসিম এসেছে, আবার ভুল ভাঙে। সারা শরীর যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যায় তাঁর।

ওয়াসিমের বোন সাবরিনা ইয়াসমিন চট্টগ্রামের একটি কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। বন্যার আগে বাড়িতে এসে আটকে পড়েছেন তিনি। সাবরিনা বলেন, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রাম নগরের ষোলশহর স্টেশনে বিক্ষোভের কথা ছিল কোটাসংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের। সকালে ভাইয়া ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে ছাত্র-জনতাকে ষোলোশহর এলাকায় আসতে অনুরোধ করেন। বেলা সাড়ে তিনটায় কর্মসূচি শুরুর আগেই স্টেশনে অবস্থান নিয়েছিল যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা—তাদের হাতে ছিল লাঠিসোঁটা, পাথর ও অস্ত্র। সেদিন গুলিবিদ্ধ হয়ে ভাইয়াসহ তিনজন শহীদ হন। সাবরিনা বলেন, ‘গণতন্ত্রের জন্য আমার ভাই জীবন দিয়েছেন। তাঁর শাহাদাতবরণের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র ফিরে এসেছে। এখন গণতান্ত্রিক দেশে আমার ভাইয়ের হত্যাকারীদের বিচার চাই।’

গত ১৩ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর স্ত্রী জুবাইদা রহমান ওয়াসিমের কবর জিয়ারত করেন এবং ওয়াসিমের মা-বাবাকে সান্ত্বনা দেন। সে সময় মা জোসনা বেগম প্রধানমন্ত্রীর কাছে শুধু একটাই দাবি জানিয়েছিলেন—ছেলে হত্যার বিচার যেন তাড়াতাড়ি হয়।

ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম দেড় কিলোমিটার দূরে একটি মাছের ঘেরে কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘দিনের যেকোনো একটা সময় আমি ওয়াসিমের কবরের পাশে যাই। আমার ছেলের সঙ্গে কথা বলি। তখন তাঁকে ছেড়ে আসতেই ইচ্ছা করে না। আমার ছেলে যেন বলে বাবা আমাকে ছেড়ে যেও না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার ছেলে জীবন দিয়ে দেশকে বাঁচিয়ে গিয়েছে, আমাদের গর্বিত করেছে। এখন আমাদের চাওয়া একটাই—ওয়াসিমসহ সব শহীদের হত্যাকারীদের বিচার। এটি হলে আমরা শান্তি পাবো।’

লাল পটভূমিতে শহীদ মোহাম্মদ ওয়াসিমের ছবি আর তাঁর ফেসবুক আইডি ‘ওয়াসিম আকরাম’ থেকে পোস্ট করা জুলাই আন্দোলন–বিষয়ক পাঁচটি স্ট্যাটাস ফ্রেমে বাঁধিয়ে দেয়ালে ঝোলানো রয়েছে। ছোট হরফ হলেও পড়তে কষ্ট হয় না। সেখানে জ্বলজ্বল করছে তাঁর সর্বশেষ স্ট্যাটাসটি—তিন শব্দের একটি আহ্বান: ‘চলে আসুন ষোলোশহর।’ সেই স্ট্যাটাস পোস্ট করার কয়েক ঘণ্টা পরই চট্টগ্রামের ষোলোশহরে কোটাবিরোধী আন্দোলনে গুলিতে নিহত হন ওয়াসিম।