জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৬-২০৩০) নিয়ে নাগরিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত ৬ জুলাই ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) আয়োজনে এই আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বর্তমান সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বড় আর্থিক সংকটের মধ্যে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। বিপুল বকেয়া ও জ্বালানি আমদানি ব্যয় মোকাবিলায় এই কৌশলপত্র প্রণয়ন করা হয়েছে। তার মতে, আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ালেই বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপ কমবে।

মন্ত্রী আরও বলেন, খসড়াটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নিয়ে তা পরিমার্জন করে মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে রুফটপ সৌরবিদ্যুৎকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করতে করসুবিধাসহ নীতিগত সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে কৃষিজমি রক্ষার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তিনি জানান, ফসলি জমি নষ্ট করে কোনো প্রকল্প নেওয়া হবে না; বরং পতিত জমি ও সরকারি সংস্থার অব্যবহৃত জমি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম এ প্রসঙ্গে বলেন, কৌশলপত্রকে শুধু উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা হিসেবে না দেখে জ্বালানি খাতের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। তার ভাষ্য, বর্তমান সংকট প্রযুক্তিগত না হয়ে নীতি ও সুশাসনের সংকট। তাই নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নয়, বরং সর্বনিম্ন ব্যয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, জবাবদিহি ও ভোক্তার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বিকেন্দ্রীভূত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পক্ষে মত দেন এবং হাজারো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর জোর দেন।

অনুষ্ঠানে সরকার ও ক্যাবের প্রস্তাবের তুলনামূলক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হয়। সরকারের প্রস্তাবে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা ও জলবায়ু অঙ্গীকারের কথা বলা হলেও ক্যাবের প্রস্তাবে জ্বালানি ন্যায়বিচার ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয় লক্ষ্য নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা গেছে। সরকার দক্ষ যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মাধ্যমে ১৫ শতাংশ সাশ্রয়ের কথা বললেও ক্যাব বলছে, সাশ্রয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করলে চাহিদার পূর্বাভাসেও তার প্রতিফলন থাকতে হবে। অন্যথায় পরিকল্পনায় অসংগতি তৈরি হবে।

ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ূন কবীর ভূঁইয়া প্রধানমন্ত্রীর ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানান। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আজকের আলোচনা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভোক্তাবান্ধব কৌশলপত্র চূড়ান্ত করতে সহায়ক হবে। তার মতে, কার্যকর কৌশলপত্র হতে হবে সাশ্রয়ী, পরিবেশগতভাবে টেকসই, বিনিয়োগবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক।

বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ কৌশলপত্রকে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখলেও মতামত দেওয়ার জন্য আরও সময় দেওয়ার দাবি জানান। তিনি নেট মিটারিংয়ের আবেদন নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা দূর করার ওপর জোর দেন। বর্তমানে অনেক আবেদন ঝুলে থাকায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত করা যাচ্ছে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট আরিফ খান সংবিধানের আলোকে জ্বালানিতে ন্যায্য প্রবেশাধিকারকে সমতাভিত্তিক উন্নয়নের মৌলিক শর্ত হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি কৌশলপত্রে 'অধিকার' ও 'সামাজিক উদ্যোগ' ধারণার সংজ্ঞা আরও সুস্পষ্ট করার এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি অবস্থান পরিষ্কারভাবে নির্ধারণের পরামর্শ দেন।

পরিবেশ ও উন্নয়নকর্মী আলমগীর কবির জ্বালানি খাতে অনিয়মের বিচারের দাবি জানিয়ে বলেন, ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিপুল অর্থ পরিশোধের বোঝা কমানো গেলে জনগণের ওপর আর্থিক চাপ কমবে। তিনি নবায়নযোগ্য জ্বালানির অর্থায়নে জনগণকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব দেন।

পরিবেশ ও উন্নয়নকর্মী আবুল কালাম আজাদ কৌশলপত্র প্রণয়নপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তার মতে, এত গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালার খসড়া প্রকাশের পর মতামত দেওয়ার জন্য মাত্র দু-তিন কর্মদিবস সময় দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। তিনি কৃষিজমি রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে বিবেচনার আহ্বান জানান।

ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক সেরাজুল ইসলাম সেরাজ বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, অতীতেও অনেক ভালো নীতিমালা ও আইন হলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি। যন্ত্রপাতির মান নিশ্চিত করার বিষয়টিকে কৌশলপত্রে গুরুত্ব দেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।

ক্যাব যুব সংসদ সদস্য নাজিফা তাজনূর জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দিয়ে বলেন, কৌশলপত্রটি প্রযুক্তিনির্ভর পরিকল্পনা নয় বরং জ্বালানি অর্থনীতি, ভোক্তা অধিকার, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের রূপরেখা হওয়া উচিত। তিনি বিইআরসি আইন সংস্কারের মাধ্যমে ভোক্তাদের ট্যারিফ পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়ার এবং আদালতে প্রতিকার চাওয়ার অধিকার দেওয়ার পক্ষে মত দেন।

সংলাপে উপস্থাপিত ২১ দফা সুপারিশে দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারের বিনিয়োগ না করার, টাস্কফোর্সে নাগরিক প্রতিনিধি রাখার, অনলাইন মনিটরিং প্ল্যাটফর্মে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ও বেঞ্চমার্ক প্রাইস নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। ভোক্তাদের ফৌজদারি আদালতে মামলা করার অধিকার, আর্থিক প্রণোদনায় সমতা, এবং কার্বন ক্রেডিটের আয় ভোক্তার মূল্যহারে সমন্বয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

সবশেষে সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা একমত পোষণ করেন যে, কৌশলপত্র বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও ভোক্তার অধিকারকে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে। জ্বালানি সুবিচার নিশ্চিত করাই এই কৌশলপত্রের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে মত দেন তারা।