মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। বুধবার ভোরে ইরাকের বিভিন্ন স্থানে ইরান–সমর্থিত পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেসের (পিএমএফ) একাধিক ঘাঁটিতে যৌথ হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব। এতে গোষ্ঠীটির অন্তত ২০ জন যোদ্ধা নিহত ও ৩২ জনের বেশি আহত হয়েছেন বলে পিএমএফ জানিয়েছে। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাগদাদ, নিনেভে, বসরা, কিরকুক, কারবালা, দিয়ালা ও ওয়াসিত প্রদেশে এই হামলা হয়েছে।

প্রায় একই সময়ে জর্ডানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে আকস্মিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা জর্ডানের মার্কিন স্থাপনায় একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তিনটি ট্যাংকারেও হামলা চালানো হয়েছে। তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এসব হামলা প্রতিহত করেছে। জর্ডানের সেনাবাহিনী পাঁচটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার দাবি করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানকে ‘চড়া মূল্য’ দিতে হবে বলে হুমকি দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, জর্ডানে হামলার জবাব দিতে মার্কিন বাহিনীর হাতে মাত্র কয়েক মিনিট সময় ছিল এবং ক্ষেপণাস্ত্রগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর আগেই ধ্বংস করা হয়েছে। ট্রাম্প ইরাকে যুক্তরাষ্ট্র–সৌদি যৌথ হামলাকে ইরাকি সরকারের সমন্বয়ে চালানো বলে দাবি করেন এবং ইরান–সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোকে ‘বিশ্বের জন্য ক্যানসার’ আখ্যা দিয়ে আরও কঠোর পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেন।

ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল–জাইদি পরিস্থিতি পর্যালোচনায় জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রিপরিষদের জরুরি বৈঠক ডেকেছেন। দেশটির প্রেসিডেন্ট নিজার আমেদি এই হামলাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ এবং ইরাকের সার্বভৌমত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ইরাকের ভূখণ্ড অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর জন্য বা আঞ্চলিক শক্তিগুলোর দ্বন্দ্ব মেটানোর ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও ইরাকে হামলার নিন্দা জানিয়ে দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররাই পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে।

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, জর্ডানে প্রায় চার হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছেন। নতুন করে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশটির মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানের অন্যতম প্রধান নিশানায় পরিণত হয়েছে। এ অবস্থায় সেনাদের মুঠোফোন ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপের কথা ভাবছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। তাদের আশঙ্কা, সেনাদের মুঠোফোনে ধারণ করা ছবি ও ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়লে তা ইরানকে হামলার নিশানা নির্ধারণ ও ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নে সহায়তা করতে পারে।

এদিকে হরমুজ প্রণালি যৌথভাবে পরিচালনার ওমানের দেওয়া প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। তেহরানের দাবি, ওই প্রস্তাব তাদের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আল–জাজিরা জানিয়েছে, চলমান সংঘাত লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালি ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাকিস্তান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও উপসাগরীয় দেশগুলো উত্তেজনা কমিয়ে আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছে। পাকিস্তানের জাতিসংঘে নিয়োজিত রাষ্ট্রদূত আসিম ইফতিখার আহমদ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে গত মাসে সই হওয়া প্রাথমিক সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) প্রতিশ্রুতি মেনে চলার আহ্বান জানান। ওই সমঝোতায় ৬০ দিনের মধ্যে আলোচনা করে যুদ্ধবিরতি চুক্তি চূড়ান্ত করার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্য দিয়ে তা ইতিমধ্যে ভেঙে পড়েছে।

আল–জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইরাকে যুক্তরাষ্ট্র–সৌদি আরবের যৌথ হামলা নাকি জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরানের হামলা—কোনটি আগে হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, আপাতত কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকার সম্ভাবনাই বেশি।