দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে চলেছে সরকার। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়—বেসরকারি, কিন্ডারগার্টেন এবং ইংরেজি মাধ্যমের প্রাথমিক স্তরের সব বিদ্যালয়কে এখন সরকারি মনিটরিংয়ের আওতায় আনা হবে। বুধবার (১৯ আগস্ট) চট্টগ্রামের পিটিআই অডিটোরিয়ামে প্রাথমিক শিক্ষা, চট্টগ্রাম বিভাগ আয়োজিত এক দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, এত দিন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মনিটরিং কাঠামো মূলত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছিল। নতুন নীতিমালায় সেই ধারা বদলে দিয়ে সব ধরনের প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে বিদ্যালয় পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র যাচাই করে শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

কর্মশালায় ববি হাজ্জাজ আরও উল্লেখ করেন, সম্প্রতি ২৫টি উপজেলার বিদ্যালয় পরিদর্শনে দেখা গেছে, জেলা ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের প্রতিবেদনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মৌলিক শিখন দক্ষতার (এফএলএন) বাস্তব অবস্থার পার্থক্য রয়েছে। এ ধরনের তথ্যগত অসঙ্গতি দূর করে বাস্তবভিত্তিক তথ্যের ভিত্তিতে শিক্ষা প্রশাসন পরিচালনার ওপর জোর দেন তিনি।

নতুন নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিটি উপজেলায় শূন্যপদে সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে মাঠপর্যায়ের তদারকি ও জবাবদিহিতা আরও শক্তিশালী হয়। আগামী বছর দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী। পাশাপাশি শিশুদের মেধা ও সৃজনশীলতা বিকাশে জাতীয় পর্যায়ে বড় পরিসরে কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে, যা টেলিভিশন শো হিসেবে সম্প্রচারেরও উদ্যোগ রয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষাকে আনন্দময়, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানসম্মত করতে বিদ্যালয় পর্যায়ে শিখন, উপস্থিতি, পুষ্টি ও শিক্ষার পরিবেশ—সব বিষয়ে সমন্বিত নজরদারি নিশ্চিত করা হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রতিমন্ত্রী সাতটি বিষয়ে কোনো আপস না করার নির্দেশ দেন। এর মধ্যে রয়েছে—প্রতিটি বিদ্যালয়ের কার্যকর ও নিয়মিত পরিচালনা, শিক্ষকের বাস্তব উপস্থিতি নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থীর সঠিক সংখ্যা যাচাই, তারা কী শিখছে তা সরাসরি পর্যবেক্ষণ, সরকারি সুবিধা প্রকৃত শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছানো, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো নিরাপদ ও ব্যবহারযোগ্য রাখা এবং শিক্ষার্থী, অভিভাবক, গণমাধ্যমকর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীল ও মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা।

ববি হাজ্জাজ বলেন, প্রাথমিক শিক্ষা শুধু সরকারি বিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি শিশুর প্রায় ১০ বছর বয়স পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই মূলত প্রাথমিক শিক্ষা। সেই শিক্ষা সরকারি, বেসরকারি কিংবা ইংরেজি মাধ্যম—যেখানেই দেওয়া হোক, শিক্ষার মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। নতুন নীতিমালায় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মনিটরিং ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত ও কার্যকর করা হবে, যার মাধ্যমে অবকাঠামো, শ্রেণিকক্ষের আয়তন, খেলার জায়গা, পাঠ্যবই ও কারিকুলাম অনুসরণ, শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ—সবকিছু নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা হবে।

প্রশিক্ষণ কর্মশালায় প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করেন, অপ্রশিক্ষিত কোনো শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষে রাখা হবে না। সরকারি ও বেসরকারি সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগের মান, প্রশিক্ষণ ও পাঠদানের সক্ষমতা ভবিষ্যৎ মনিটরিং ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে বলেও জানান তিনি।

উল্লেখ্য, বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শিক্ষা প্রশাসনে সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে নিজে বিভাগে বিভাগে প্রশিক্ষণ সেশন পরিচালনা করছেন প্রতিমন্ত্রী। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নেতৃত্বদানের সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রশাসনিক দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রস্তুত করাই এই প্রশিক্ষণের মূল লক্ষ্য।

চট্টগ্রাম বিভাগের প্রাথমিক শিক্ষা উপপরিচালক মো. নূরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. আবদুর রহিম। চট্টগ্রাম বিভাগের সব জেলার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও বিভাগের শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারা অংশ নেন।