রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান: রংতুলিতে মুক্ত স্বদেশ’ শীর্ষক তিন দিনব্যাপী চিত্রপ্রদর্শনীর একটি কাজ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গত রোববার সিনেট ভবন চত্বরে প্রদর্শনীটির উদ্বোধন হয়, যা মঙ্গলবার রাত আটটা পর্যন্ত চলার কথা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আয়োজনে এতে ৮০টি শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে। কিন্তু সেই ৮০টির মধ্যেই একটি চিত্রকর্মে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের চেয়ে ছোট করে দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী। বিতর্কের পর সোমবার চিত্রকর্মটি প্রদর্শনী থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

যে চিত্রকর্মটি নিয়ে এত আলোচনা, তাতে দেখা যায় একটি মুষ্টিবদ্ধ হাত দাঁড়িপাল্লা ধরে আছে। পাল্লার এক পাশে লাল রঙে লেখা ‘৭১’, অন্যপাশে কালচে রঙে ‘২৪’। আর ‘২৪’-এর পাল্লাটি কিছুটা নিচের দিকে হেলে রয়েছে। এই উপস্থাপনাকে মুক্তিযুদ্ধের চেয়ে ২০২৪-কে গুরুত্বপূর্ণ বোঝানোর চেষ্টা হিসেবে দেখছেন অনেকে।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুলের মতে, একাত্তরের পরাজিত শক্তি বারবার দুটি ইতিহাসকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, চব্বিশ আর একাত্তরের তুলনা হওয়ারই কথা নয়। কিন্তু এই প্রচেষ্টা শেষমেশ নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কাহিনিকেই জোরদার করছে। প্রশ্ন রেখেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আয়োজনে এমন চিত্রকর্ম কীভাবে স্থান পেল?

অপরদিকে শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। ইচ্ছাকৃত হলে এটি শিল্পকর্মের বিকৃতি তো বটেই, ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতিও চরম অসম্মান। ১৯৭১ স্বাধীনতা ও আত্মত্যাগের গৌরবময় অধ্যায়, এর মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখা জরুরি। ২০২৪-ও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, তার যথাযথ মূল্যায়ন দরকার। তবে ১৯৭১-কে হেয় বা আড়াল করে ২০২৪ কখনো বড় হয় না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক হাফেজ মেহেদী হাসান অবশ্য বলেছেন, একাত্তর ও চব্বিশ সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটের ঘটনা। দুটি সময়কে পরস্পরের বিপরীতে দাঁড় করানো ঠিক নয়। বরং উভয়ের প্রেরণাকে ধারণ করে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

অভিযোগের জবাবে চিত্রকর্মটির শিল্পী অবশ্য বলেছেন, এটি নিছক আলংকারিক উপস্থাপনা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, খালি চোখে দেখলে মনে হতে পারে ২০২৪-কে বেশি মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তাঁর উদ্দেশ্য তা নয়। জুলাইয়ের পর থেকেই একটি গোষ্ঠী ২০২৪-কে ১৯৭১-এর বিপরীতে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। দাঁড়িপাল্লা ওজন মাপার যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং ‘২৪’-এর পাশে ছোট ছোট নুড়িপাথর দিয়ে পাল্লাটিকে ভারী দেখানো হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা কম বা বেশি করার কোনো সম্পর্ক এতে নেই বলে জানান তিনি।

চিত্রকর্মটি প্রদর্শনীর জন্য কীভাবে অনুমোদন পেল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক অধ্যাপক আরিফুল ইসলাম জানান, ডিনের অনুপস্থিতিতে তিনি দায়িত্বে ছিলেন। তিনি শুধু একটি চিঠিতে সই করেছেন, ছবিগুলো যাচাই না করেই পাঠানো হয়েছিল। সহ-উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল আলীম বলেন, বিষয়টি তিনি অনলাইনে কিছুটা দেখেছেন, পুরোটা জেনে পরে কথা বলবেন। তবে তাঁর মতে, একাত্তর সার্বভৌমত্ব ও অস্তিত্বের লড়াই, আর চব্বিশ ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই—দুটি কখনো এক নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ প্রশাসক অধ্যাপক এস এম কামরুজ্জামান জানান, সমালোচনার পর সোমবার চিত্রকর্মটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অনুষ্ঠানটি চারুকলা অনুষদের তত্ত্বাবধানে হয়েছে এবং তাদের দায়িত্ব ছিল সিনেট ভবনে প্রদর্শনীর জায়গা নির্ধারণ করা। বিতর্কিত কোনো বিষয়কে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রশ্রয় দেবে না বলেও জানান তিনি।