নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) উচ্চপর্যায়ের অধিবেশন শুরু হয়েছে সোমবার (১৩ জুলাই)। এতে সভাপতিত্ব করেন ইকোসকের প্রেসিডেন্ট লোক বাহাদুর থাপা। ওই অধিবেশনে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) গ্রুপের পক্ষে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি জানান, নজিরবিহীন রাজনৈতিক, সামষ্টিক অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও বৈশ্বিক অভিঘাতের কারণে বাংলাদেশ ও নেপাল এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় আরও তিন বছর বাড়ানোর আবেদন জানিয়েছে। অর্থাৎ ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। উপদেষ্টা বলেন, জটিল অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে উত্তরণের পথে থাকা দেশগুলোর জন্য এই অতিরিক্ত সময় কোনো বিলাসিতা নয়। বরং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, সুষ্ঠু উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়ন এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার জোরদারের জন্য এটি কৌশলগতভাবে জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে ১৪টি এলডিসি বিভিন্ন পর্যায়ে উত্তরণ প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। তাদের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ধারাবাহিক সহায়তা অপরিহার্য। এলডিসি গ্রুপ টেকসই উন্নয়নের জন্য ২০৩০ এজেন্ডা এবং দোহা কর্মসূচির প্রতি তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করছে বলে জানান তিতুমীর। তার মতে, এই দুটি কাঠামো স্বল্পোন্নত দেশগুলোর টেকসই, সহনশীল উন্নয়ন এবং সুষ্ঠু ও টেকসই উত্তরণের পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করছে। তিনি আরও বলেন, ২০৩০ সালের চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকে এগোলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের অগ্রগতি উদ্বেগজনকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে এলডিসিগুলোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও সংকটপূর্ণ। দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত দুর্বলতা, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, ঋণের বোঝা বৃদ্ধি, সীমিত রাজস্ব সক্ষমতা, সরকারি উন্নয়ন সহায়তা (ওডিএ) হ্রাস, ডিজিটাল বৈষম্য এবং সাশ্রয়ী অর্থায়নের সীমিত সুযোগ—এসব বিষয় উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, এই চ্যালেঞ্জগুলো শুধু ২০৩০ এজেন্ডা বাস্তবায়নকেই ব্যাহত করছে না, বরং ২০৩১ সালের মধ্যে আরও বেশি এলডিসিকে টেকসই ও অপরিবর্তনীয়ভাবে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের লক্ষ্যসহ দোহা কর্মসূচির উদ্দেশ্য বাস্তবায়নকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এলডিসি গ্রুপের পক্ষ থেকে পাঁচটি অগ্রাধিকার তুলে ধরেন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। প্রথমত, ক্রমবর্ধমান ঋণঝুঁকি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত, পূর্বানুমানযোগ্য ও স্বল্পসুদে ঋণসহ অনুকূল অর্থায়ন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, উৎপাদন সক্ষমতা, সহনশীল অবকাঠামো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক সুরক্ষা এবং মৌলিক সেবায় বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি। দ্বিতীয়ত, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর কাঠামোগত দুর্বলতাকে বিবেচনায় এনে আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোর সংস্কার করতে হবে। অনুকূল অর্থায়নে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি, ঋণ পরিশোধে স্থগিতাদেশ, টেকসই ঋণ সমাধান এবং আরও ন্যায্য অর্থায়ন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, জলবায়ু অর্থায়ন সহজলভ্য, পূর্বানুমানযোগ্য এবং দেশগুলোর ঝুঁকির মাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। অভিযোজন, সহনশীলতা বৃদ্ধি, জ্বালানি রূপান্তর এবং ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’-এর জন্য প্রদত্ত সহায়তা অতিরিক্ত, পর্যাপ্ত এবং সহজে প্রাপ্তিযোগ্য হতে হবে বলে তিনি জানান। পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও সহনশীল অবকাঠামোয় বিনিয়োগের মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলেন। চতুর্থত, সুরক্ষাবাদী প্রবণতা থেকে সরে এসে এলডিসিগুলোর জন্য বাজার প্রবেশাধিকার সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ করতে হবে। পঞ্চমত, প্রযুক্তি হস্তান্তর, সক্ষমতা উন্নয়ন এবং ডিজিটাল রূপান্তরে সহযোগিতা বাড়িয়ে ডিজিটাল ও প্রযুক্তিগত বৈষম্য দূর করতে হবে, যাতে স্বল্পোন্নত দেশগুলো উদ্ভাবনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে টেকসই উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে পারে।
এলডিসি উত্তরণে অতিরিক্ত তিন বছর চাওয়া বিলাসিতা নয়: উপদেষ্টা তিতুমীর
বাংলাদেশ ও নেপাল এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর আবেদন জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, এটি বিলাসিতা নয় বরং কৌশলগত প্রয়োজন। তিনি জাতিসংঘের ইকোসক অধিবেশনে এলডিসি গ্রুপের পক্ষে পাঁচটি অগ্রাধিকার তুলে ধরেন।

