ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি ঝোঁক ছিল মধু সাপ্রের। জাতীয় স্তরের অ্যাথলেট হিসেবে তিনি একাধিক পদক জিতেছিলেন। বাবার উৎসাহে খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। ফ্যাশন দুনিয়ার সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্কই ছিল না। তবে খ্যাতিমান আলোকচিত্রী শান্তনু শিওরে তাঁর প্রতি নজর দেন এবং মডেলিংয়ের প্রস্তাব দেন। সেখান থেকেই পথচলা শুরু হয়। প্রথম কাজ ছিল একটি পোশাক ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপন। এরপর ১৯৯২ সালে প্রায় অনিচ্ছায় অংশ নেন ফেমিনা মিস ইন্ডিয়া প্রতিযোগিতায়। সেই প্রতিযোগিতায় জয়ী হয়ে তিনি ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন মিস ইউনিভার্সে। সেখানে দ্বিতীয় রানারআপ হয়ে ইতিহাস গড়েন—এতদিন পর্যন্ত কোনো ভারতীয় প্রতিযোগী শীর্ষ তিনে পৌঁছাতে পারেননি।
মিস ইউনিভার্স প্রতিযোগিতায় তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, এক দিনের জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী হলে কী করতেন? মধু উত্তর দিয়েছিলেন, এক দিনে দেশের দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব নয়। তবে শিল্প ও খেলাধুলার উন্নয়নে কাজ করা জরুরি। কারণ একজন খেলোয়াড় হিসেবে তিনি নিজেই পর্যাপ্ত মাঠ ও সরঞ্জামের অভাব অনুভব করেছেন। পরবর্তীকালে মধু স্বীকার করেন, ইংরেজিতে সাবলীল না হওয়ায় নিজের ভাবনা ঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারেননি। তবু হৃদয়ের কথা বলেছিলেন বলেই আজও সেই উত্তর মানুষের মনে গেঁথে রয়েছে।
মিস ইন্ডিয়া হওয়ার পর মধু দ্রুতই ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় সুপারমডেলে পরিণত হন। একের পর এক বড় ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপন ও চলচ্চিত্রের প্রস্তাব আসতে থাকে। ঠিক সেই সময়ে ১৯৯৫ সালে আসে সেই বহুল আলোচিত বিজ্ঞাপন। টাফ শুজের প্রচারণার জন্য তোলা সাদা-কালো ছবিতে মধু সাপ্রে ও মিলিন্দ সোমানকে নগ্ন অবস্থায় একটি অজগর সাপ জড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ছবিটি প্রকাশের পর শুরু হয় তীব্র বিতর্ক। অশ্লীলতা এবং বন্য প্রাণী সুরক্ষা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। আদালতে সেই মামলা চলতে থাকে টানা ১৪ বছর। শেষ পর্যন্ত দুজনই খালাস পান।
বহু বছর পর মধু সাপ্রে বলেন, তিনি কখনোই কাউকে আঘাত করার উদ্দেশ্যে ছবিটি তোলেননি। তাঁর ভাষায়, যদি জানতেন এত বড় বিতর্ক তৈরি হবে, তাহলে কাজটি করতেন না। অনেকেই ভেবেছিলেন, প্রচার পাওয়ার জন্য তিনি এমন ছবি তুলেছিলেন। কিন্তু মধুর দাবি ছিল ভিন্ন। তিনি জানান, অর্থ বা প্রচারের জন্য নয়, ভারতের অন্যতম সেরা আলোকচিত্রী প্রবুদ্ধ দাশগুপ্তের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ থেকেই ছবিটি তুলেছিলেন। এমনকি ওই কাজের জন্য তিনি কোনো পারিশ্রমিকও নেননি।
বিতর্কের প্রভাব আদালতের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। সে সময় বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, প্রযোজকদের সংগঠন মধুকে নিয়ে কাজ না করার পরামর্শ দিয়েছিল। মিলিন্দ সোমানের বিপরীতে অমোল পালেকরের একটি ছবিতে অভিনয়ের কথা থাকলেও সেটি আর নির্মিত হয়নি। পরে আন্তর্জাতিক মডেলিংয়ের ব্যস্ততা এবং দীর্ঘ সময় লন্ডন ও প্যারিসে থাকার কারণে মধুও সেই প্রকল্প থেকে সরে আসেন।
মিলিন্দ সোমান ও মধু সাপ্রে একসময় ভারতের সবচেয়ে আলোচিত তারকা জুটির অন্যতম ছিলেন। অনেকেই মনে করেছিলেন, তাঁদের বিয়ে সময়ের অপেক্ষামাত্র। কিন্তু নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে মতপার্থক্যের কারণে তাঁদের সম্পর্ক ভেঙে যায়।
২০০১ সালে ইতালীয় ব্যবসায়ী জিয়ান মারিয়া এমেন্দাতোরিকে বিয়ে করে ইতালিতে চলে যান মধু। সেখানে থেকেও আন্তর্জাতিক মডেলিং চালিয়ে যান। ২০০৩ সালে 'বুম' চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অভিনয়ে অভিষেক হলেও ছবিটি বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়নি।
দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক মডেলিং, চলচ্চিত্র ও পারিবারিক ব্যস্ততার মধ্যে জীবন কাটানোর পর ২০১০ সালে তিনি কাজ থেকে বিরতি নেন। কারণ, তিনি মা হতে চেয়েছিলেন। বহু বছর চেষ্টার পর ২০১২ সালে জন্ম নেয় তাঁর মেয়ে ইন্দিরা। এরপর অভিনয় ও মডেলিংয়ে পুরোপুরি ফেরার পরিকল্পনা থাকলেও একের পর এক ব্যক্তিগত বিপর্যয় তাঁকে বদলে দেয়। বাবার মৃত্যু, মানসিক সংকট, বিবাহবিচ্ছেদ এবং পরে ভাইয়ের মৃত্যু—সব মিলিয়ে জীবনের কঠিন সময় পার করতে হয় তাঁকে। তবু তিনি ভেঙে পড়েননি। মধুর ভাষায়, 'জীবন বারবার আমাকে মাটিতে ফেলে দিয়েছে, আর আমি প্রতিবারই নিজে উঠে দাঁড়িয়েছি।'
বর্তমানে ইতালিতেই বসবাস করছেন মধু সাপ্রে। মেয়ে ইন্দিরার দেখাশোনায় সময় কাটান। স্কুল, খেলাধুলা, দৈনন্দিন যত্ন—সবকিছুতেই নিজে অংশ নেন। তিনি বলেন, জীবনে মিস ইন্ডিয়া হওয়া, আন্তর্জাতিক সুপারমডেল হিসেবে সাফল্য পাওয়া—সবই অসাধারণ অভিজ্ঞতা। কিন্তু মা হওয়ার পরই তিনি নিজেকে সবচেয়ে পরিপূর্ণ মনে করেছেন।




