যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ডেটা সেন্টারগুলোর ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে একটি বিতর্কিত গ্রিড সম্প্রসারণ প্রকল্প হাতে নিয়েছে স্থানীয় পাবলিক ইউটিলিটি কোম্পানি জর্জিয়া পাওয়ার। প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় আগামী পাঁচ বছরে ১ হাজার মাইলের বেশি দীর্ঘ ট্রান্সমিশন লাইন নির্মাণ করা হবে, যা ৩৩০টিরও বেশি জমির প্লট জুড়ে বিস্তৃত এবং এতে প্রায় ৩০টি আবাসিক সম্পত্তি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হবে। এই উদ্যোগের ফলে শতাধিক জমির মালিককে নিজেদের সম্পত্তি হারানোর আশঙ্কায় পড়তে হচ্ছে।

এমনই এক ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির মালিক আনসলি ব্রাউন। তিনি ইনস্টাগ্রামে একটি পোস্টে জানান, তাঁর শৈশবের বাড়ি জর্জিয়া পাওয়ার কেড়ে নিচ্ছে। তিনি বলেন, কোম্পানি পুরো সম্পত্তি মাটিতে মিশিয়ে দেবে। তার পরিবারের সঙ্গে আলোচনা শেষ পর্যন্ত সমঝোতার মাধ্যমে মীমাংসা হয়েছে বলে জর্জিয়া পাওয়ারের পক্ষ থেকে জানানো হলেও চুক্তির সুনির্দিষ্ট শর্ত প্রকাশ করা হয়নি।

প্রকল্পটির নাম দেওয়া হয়েছে অ্যাশলি পার্ক-ওয়ানসলি ট্রান্সমিশন প্রকল্প। এটি ফায়েট, হার্ড, ফুলটন ও কাওয়েটা কাউন্টির ৩৫ মাইল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। জর্জিয়া পাওয়ারের মুখপাত্র জানান, এই লাইন নির্মাণের উদ্দেশ্য হলো বৃহত্তর সম্প্রদায় ও গ্রাহকদের নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সেবা দেওয়া। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন, এটি ডেটা সেন্টার বুমের আরেকটি নেতিবাচক পরিণতি। আনসলি ব্রাউন এক ভিডিওতে বলেন, তাদের কোনো পছন্দ নেই; শুধু ডেটা সেন্টারের জন্যই এই লাইন সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।

জর্জিয়া পাওয়ার অবশ্য দাবি করছে যে তারা ডেটা সেন্টার ব্যবসায় নেই এবং এই লাইন ডেটা সেন্টারকেন্দ্রিক নয়। কিন্তু সিবিএস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই প্রকল্পের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বিদ্যুৎ সরাসরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ডেটা সেন্টারে যাবে। জর্জিয়া পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে, যেখানে বলা হয় এর প্রায় ৮০ শতাংশ ডেটা সেন্টারকে বিদ্যুৎ দেবে।

ট্রান্সমিশন রুট নির্ধারণে জর্জিয়া পাওয়ার দাবি করে যে তারা একাধিক ধাপের মূল্যায়ন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে, যার মধ্যে জমির বিদ্যমান ব্যবহার ও সম্প্রদায়ের বিবেচনা অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু রুটের মধ্যে পড়া বাড়ির মালিকদের সামনে দুটি বিকল্প: হয় সম্পূর্ণ সম্পত্তি বিক্রি করে দেওয়া, অথবা কোম্পানিকে একটি 'রাইট-অফ-ওয়ে' বা ইজমেন্ট প্রদান করা। জর্জিয়া পাওয়ারের মিডিয়া রিলেশনস ম্যানেজার মেরেডিথ স্টোন বলেন, তারা মূল্যায়নের ১২৫ শতাংশ থেকে শুরু করে দর কষাকষি করেন এবং যতক্ষণ জমির মালিক সন্তুষ্ট না হন ততক্ষণ আলোচনা চলে। বিরল ক্ষেত্রে তারা এমিনেন্ট ডোমেইন আইন প্রয়োগ করতে পারে, যা পঞ্চম সংশোধনীর আওতায় সরকারি প্রয়োজনে ব্যক্তিগত সম্পত্তি কেড়ে নেওয়ার অনুমতি দেয়। কোম্পানির দাবি, গত বছর মাত্র পাঁচবার এই প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হয়েছে এবং কোনো আবাসিক বাড়ির ক্ষেত্রে নয়।

তবে জমির মালিকদের প্রতিনিধিত্বকারী আইনজীবী ডেভিড নিডহ্যাম সতর্ক করে বলেন, স্থায়ী ইউটিলিটি ইজমেন্ট চুক্তিগুলো এমন যে সম্পত্তি বিক্রির পরও তা জমির সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। এই চুক্তিগুলো পাওয়ার কোম্পানির পক্ষে ভারসাম্যহীন এবং লাইনের নিচে স্থায়ী কাঠামো নির্মাণ নিষিদ্ধ করতে পারে, এমনকি অতিরিক্ত অবকাঠামো স্থাপনের অধিকারও সংরক্ষণ করতে পারে। তিনি বলেন, এটি জনস্বার্থ ও ব্যক্তিগত স্বার্থের মধ্যে সীমারেখা ঝাপসা করে দেয়।

জর্জিয়ায় ডেটা সেন্টার বিনিয়োগের জন্য অসংখ্য কর প্রণোদনা রয়েছে। রাজ্যটি সরঞ্জাম ও অবকাঠামোর ওপর ১০০ শতাংশ বিক্রয় ও ব্যবহার কর ছাড় দেয়, যার জন্য ন্যূনতম ১০ থেকে ২৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। বর্তমানে জর্জিয়ায় ২০০টির বেশি ডেটা সেন্টার চালু রয়েছে, যার মধ্যে ১৭০টি আটলান্টায়। মাইক্রোসফট, অ্যামাজন ও গুগলের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টদের ডেটা সেন্টার রয়েছে সেখানে। তবে সম্প্রতি রাজ্যের আইনপ্রণেতারা এই প্রণোদনা থেকে সরে আসার চেষ্টা করেছেন। ২০২৪ সালে তারা নতুন ছাড় স্থগিতের পক্ষে ভোট দিলেও গভর্নর কেম্প তা ভেটো দেন। ইউনিভার্সিটি অফ জর্জিয়ার এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই কর ছাড়ের ফলে রাজ্যের নেট রাজস্ব ক্ষতি হবে প্রায় ৫৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার।

জর্জিয়া পাওয়ার অবশ্য দাবি করছে যে এই প্রকল্পের ফলে গ্রাহকরা দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয় পাবেন—প্রতি বছর প্রতি আবাসিক গ্রাহকের গড়ে ১০২ ডলার সাশ্রয় হবে, যা ২০২৯ সাল থেকে কার্যকর হবে। কোম্পানি বলছে, বড় লোড গ্রাহকদের বেশি চার্জ দিয়ে আবাসিক গ্রাহকদের ওপর চাপ কমানো হবে। তবে সমালোচকদের মতে, এই উন্নয়নের প্রকৃত খরচ বহন করবে সাধারণ মানুষ, যাদের জমি ও বাড়ি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।