বৈশ্বিক ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে রাষ্ট্রনেতা বা নির্বাচিত সরকারের চেয়েও গভীরে অবস্থান করছে কতিপয় পরিবার। বিপুল সম্পদ ও প্রভাবের জোরে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি থেকে রাজনৈতিক নীতিনির্ধারণ—সর্বত্রই তাদের যেন অদৃশ্য অথচ শক্ত হাত। ইতিহাসের পরতে পরতে ছড়িয়ে থাকা এমন সাতটি কুল বা বংশ সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো।

প্রথমেই আসে ইউরোপের ব্যাংকিং জগতের সম্রাট রথসচাইল্ড পরিবারের নাম। জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে অষ্টাদশ শতকে মেয়ার আমশেল রথসচাইল্ডের নেতৃত্বে যাত্রা শুরু করে এই বংশীয়রা লন্ডন, প্যারিস, ভিয়েনার মতো শহরে নিজেদের সাম্রাজ্য বিস্তৃত করেছিল। এটি ছিল এমন একটি পরিসর, যখন একাধিক ইউরোপীয় সরকার এবং ভয়াবহ যুদ্ধেও তারাই ছিল মূল পুঁজি যোগানদাতা। তাদের সম্মিলিত আর্থিক পরিমাপ কী, সে হিসাব আজও পুরোপুরি মেলেনি।

যুক্তরাষ্ট্রের খুচরা বাণিজ্যের দানব ওয়ালমার্টের মালিকানা ধরে রেখেছে ওয়ালটন পরিবার, যারা বৈশিব্য চেইনের মাধ্যমে দ্বিতীয় অবস্থানে। স্যাম ওয়ালটন ১৯৬২ সালে এর ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। এখন ২৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ তাদের নিয়ন্ত্রণে। লাখ লাখ মানুষের দৈনন্দিন কেনাকাটার রীতি থেকে শুরু করে বিশ্ব বাণিজ্যের সরবরাহ শৃঙখলা পর্যন্ত তাদের প্রভাব অনস্বীকার্য।

অপরদিকে, রাজনীতির অন্দরমহলে কোচ পরিবারের ভূমিকা বিস্ময়কর। তাদের সহায়তা সম্পদ ১২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। চার্লস ও ডেভিড কোচের গঠিত এই বাণিজ্যিক জাল নিজেদের স্বার্থের বেড়াজালে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়মনীতি প্রভাবিত করতে কোটি কোটি ডলার ব্যয় করে। মার্কিন নির্বাচনে বিপুল অর্থায়নের মাধ্য তারা সরকারি নীতি গড়নে নীরবে সাহায্য করে।

সৌদি আরবের শাসক আল সৌদ রাজপরিবারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো। ১৯৩২ সাল থেকে রাজক্ষমতায় বসা এই বংশ তেলের বৈশ্বিক সরবরাহ ও মূল্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, তাদের মোট আর্থিক ভান্ডার ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের প্রথম বিলিয়নিয়ার জন ডি. রকফেলারের পরিবার স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের মাধ্যমে এক সময় দেশের প্রায় ৯০ ভাগ তেল শিল্প একাই পরিচালনা করত। তাদের হাত ধরেই তৈরি হয় গোপন সংগঠন বিল্ডারবার্গ গ্রুপ, যেখানে প্রতি বছর বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নিভৃত বৈঠকে বসেন।

একজন ব্যক্তি যে একটি রাষ্ট্রের চেয়েও বেশি অর্থনৈতিক শক্তির অধিকারী হতে পারেন, জে পি মরগান তার প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। ১৮৯৫ ও ১৯০৭ সালের ভয়াবহ মন্দা পর্বে তিনি ব্যক্তিগত অর্থে যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেন। জেনারেল ইলেকট্রিক ও ইউএস স্টিলের মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠান গঠনে তাদের অবদান আধুনিক কর্পোরেট ফাইন্যান্সের ভিত গড়েছে।

সর্বশেষ আছে ডু পন্ট পরিবার, যাদের ১৮০২ সালে পথচলা শুরু বারুদ তৈরির ফ্যাক্টরি দিয়ে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে গোটা বিশ্বে ব্যবহৃত বিস্ফোরকের ৪০ ভাগ উৎপাদন করত তারা। ম্যানহাটান প্রকল্প তথা পারমাণবিক অস্ত্র গঠনেও ছিল তাদের বড় অবদান। আধুনিক জীবনে নাইলন ও টেফলনের মতো উদ্ভাবনের পেছনে রয়েছে ডু পন্টের উত্তরাধিকার। অর্থ ও ক্ষমতার এই অপূর্ব মেলবন্ধন সত্যই চিত্তাকর্ষক।