থ্যালাসেমিয়া জিনগতভাবে সঞ্চারিত একটি গুরুতর রক্তরোগ। এ রোগে দেহ পর্যাপ্ত পরিমাণে সুস্থ লোহিত রক্তকণিকা উৎপাদনে সক্ষম হয় না। ফলে আক্রান্ত রোগীদের অনেককেই নিয়মিত রক্ত সঞ্চালনের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু বারবার রক্ত গ্রহণের ফলে শরীরে ধীরে ধীরে অতিরিক্ত লৌহ জমতে থাকে, যা পরবর্তীতে লিভার, হৃৎপিণ্ড ও বিভিন্ন অন্তঃস্রাবী গ্রন্থির গুরুতর ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই এই রোগীদের জন্য সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের নিয়ম জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

খাদ্য পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো সুষম পুষ্টি নিশ্চিত করা, শরীরে অতিরিক্ত লৌহ জমা প্রতিরোধে সহায়তা করা, হাড়ের স্বাস্থ্য বজায় রাখা, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশ নিশ্চিত করা। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, রোগীর রক্তে সেরাম ফেরিটিনের মাত্রা বেশি থাকলে আয়রনসমৃদ্ধ খাবার সীমিত রাখতে হবে। বিশেষ করে লাল মাংস—যেমন গরু ও খাসির মাংস—কলিজা, হৃৎপিণ্ড, কিডনি, ভুঁড়ি, ঝিনুক, আয়রন-ফর্টিফায়েড সিরিয়াল এবং অতিরিক্ত আয়রনযুক্ত সাপ্লিমেন্ট গ্রহণে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

প্রোটিনের ভালো উৎস হিসেবে দুধ ও দুধজাত খাবার, মাছ, ডিম, মুরগির মাংস, বিভিন্ন ধরনের ডাল এবং সয়াজাতীয় খাবার তালিকায় রাখা যেতে পারে। নতুন রক্তকণিকা গঠনের জন্য ফলিক অ্যাসিড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে মসুর ডাল, ছোলা, অন্যান্য ডাল, সবুজ শাকসবজি যেমন পালংশাক, ঢ্যাঁড়স ও ব্রকলি, বাদাম, ডিম, কলা এবং কমলা উল্লেখযোগ্য।

হাড়ের ক্ষয় থ্যালাসেমিয়ায় একটি সাধারণ সমস্যা। তাই ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি ও ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার নিয়মিত গ্রহণ করতে হবে। দুধ, টক দই, ছানা, পালংশাক, কলমিশাক, লালশাক, কাঁটাসহ ছোট মাছ, তিল ও কাঠবাদাম হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষায় সহায়ক। যদিও ভিটামিন সি খাবারের লৌহ শোষণের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, তবুও এটি সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া উচিত নয়। কারণ এটি রোগপ্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি, ক্ষত নিরাময়, কোলাজেন তৈরি ও কোষের অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যাঁদের সেরাম ফেরিটিনের মাত্রা বেশি, তাঁরা ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ খাবার প্রধান খাবারের দুই থেকে তিন ঘণ্টা পরে খেতে পারেন। আমলকী, পেয়ারা, কাঁচা মরিচ, লেবু, কমলা বা মাল্টা, কাঁচা আম, টমেটো, বাঁধাকপি, ফুলকপি ও পাকা পেঁপে এই ভিটামিনের উৎকৃষ্ট উৎস।

শারীরিক ব্যায়ামের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম—যেমন হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার ও হালকা রেজিস্ট্যান্স এক্সারসাইজ—থ্যালাসেমিয়া রোগীর জন্য বিশেষভাবে উপকারী। শিশুদের ক্ষেত্রে তাদের বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং নিয়মিত খেলাধুলায় উৎসাহিত করতে হবে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পান করা, নেশাজাতীয় দ্রব্য যেমন অ্যালকোহল ও ধূমপান পরিহার করা, অতিরিক্ত ফাস্ট ফুড, কোমল পানীয়, অতিরিক্ত চর্বি ও লবণযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা আবশ্যক।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সব থ্যালাসেমিয়া রোগীর জন্য একই ধরনের খাদ্য পরিকল্পনা প্রযোজ্য নয়। রোগের ধরন, বয়স, রক্তে ফেরিটিনের মাত্রা, লৌহ চিলেশন থেরাপির উপস্থিতি এবং অন্যান্য শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে খাদ্যতালিকা নির্ধারণ করা উচিত। এই গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনাগুলো প্রদান করেছেন মো. নাহিদ নেওয়াজ, টেকনিক্যাল অফিসার-নিউট্রিশন, হিড বাংলাদেশ।