আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের ফুটবল দ্বন্দ্বের ইতিহাসে মাত্র কয়েকটি দেখাই হয়েছে, কিন্তু প্রতিটি ম্যাচই অমর হয়ে আছে বিতর্কিত ও নাটকীয় ঘটনায়। মারাদোনার 'হ্যান্ড অব গড' থেকে শুরু করে ফুটবলের নিয়ম বদলে দেওয়া রাতিনের বহিষ্কার পর্যন্ত এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। এবারের বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে আবারও মুখোমুখি হওয়ার প্রাক্কালে এই দ্বন্দ্বের পাঁচটি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা তুলে ধরা হলো।
প্রথমেই আসে ১৯৮৬ বিশ্বকাপের সেই বিখ্যাত ঘটনার কথা। মেক্সিকোর আজতেকা স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে ডিয়েগো মারাদোনা গোলরক্ষক পিটার শিলটনের সঙ্গে লাফিয়ে হাত দিয়ে বল জালে জড়িয়ে দেন। তিউনিশিয়ান রেফারি আলি বিন নাসের গোল বহাল রাখলে বিতর্ক শুরু হয়। মারাদোনা সেটিকে 'হ্যান্ড অব গড' বলে আখ্যা দেন। মাত্র চার মিনিট পরেই তিনি ৬০ গজ দূর থেকে বল নিয়ে চার ইংলিশ খেলোয়াড়কে কাটিয়ে আরেক গোল করেন, যা 'গোল অব দ্য সেঞ্চুরি' হিসেবে পরিচিতি পায়। আর্জেন্টিনা ম্যাচটি ২-১ ব্যবধানে জয় করে এবং পরে শিরোপা জেতে।
দ্বিতীয় ঘটনা ১৯৯৮ বিশ্বকাপের। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচে ইংল্যান্ডের ডেভিড বেকহাম লাল কার্ড দেখেন। আর্জেন্টিনার ডিয়েগো সিমিওনের ফাউলের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে বেকহামকে মাঠ ছাড়তে হয়। ২-২ সমতা থাকা অবস্থায়ই তিনি মাঠ ছাড়েন। এরপর ১০ জনের ইংল্যান্ড ম্যাচ টাইব্রেকারে নিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত হেরে যায়। বেকহামের লাল কার্ডটি দুই দেশের দ্বন্দ্বের একটি মাইলফলক হয়ে রয়েছে।
তৃতীয় উল্লেখযোগ্য ঘটনা ২০০২ বিশ্বকাপের। জাপানের হোক্কাইদোতে মরিসিও পচেত্তিনো মাইকেল ওয়েনকে ফাউল করেছেন বলে পেনাল্টি পায় ইংল্যান্ড। ডেভিড বেকহাম সেই পেনাল্টি থেকে গোল করেন। ইংল্যান্ড ম্যাচটি ১-০ ব্যবধানে জিতে নকআউট পর্বে চলে যায়। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়। পচেত্তিনো পরে দাবি করেন, ওয়েন ডাইভ দিয়েছিলেন এবং তিনি মোটেও স্পর্শ করেননি। রেফারি পিয়েরলুইজি কলিনা ছিলেন সেই সময়ের আলোচিত মধ্যস্থ।
চতুর্থ ঘটনা ১৯৭৭ সালের একটি প্রীতি ম্যাচের। আর্জেন্টিনার বোম্বোনেরা স্টেডিয়ামে ম্যাচের শেষ সাত মিনিটে ইংল্যান্ডের ট্রেভর চেরি আর্জেন্টিনার দানিয়েল বার্তোনিকে কঠোর ট্যাকল করেন। ক্ষিপ্ত হয়ে বার্তোনি সোজা চেরির মুখে মুষ্টি বসিয়ে দেন। এতে চেরির সামনের দুটি দাঁত ভেঙে যায়। রেফারি দুজনকেই লাল কার্ড দেখান। এই ঘটনায় চেরি নাম লেখান ইতিহাসে—আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে লাল কার্ড পাওয়া প্রথম ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে।
পঞ্চম ঘটনা ১৯৬৬ বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালের। ওয়েম্বলিতে আর্জেন্টিনার আন্তোনিও রাতিন জার্মান রেফারি ক্রাইটলাইন কর্তৃক অসন্তোষ প্রকাশের দায়ে মাঠ ছাড়ার নির্দেশ পান। কিন্তু রেফারির ভাষা না বোঝায় তিনি দোভাষী দাবি করে প্রায় ১০ মিনিট মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। পরে পুলিশ ডেকে তাঁকে সরানো হয়। সেই সময় ফুটবলে হলুদ-লাল কার্ডের প্রচলন ছিল না। এই ঘটনাই পরবর্তী সময়ে কার্ড ব্যবস্থা চালুর একটি প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কাকতালীয়ভাবে, রাতিন সম্প্রতি ৮৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন, আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড সেমিফাইনাল লাইনআপ চূড়ান্ত হওয়ার দিনই।
এই দ্বন্দ্বের পেছনে ফকল্যান্ড যুদ্ধের রাজনৈতিক প্রভাবও উল্লেখযোগ্য। তবে মাঠের লড়াইয়ের এই পাঁচটি অধ্যায় দুই দেশের ফুটবল ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে আছে।

