প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে পরিচালিত প্যারাসেইলিং কার্যক্রমের বলি হলেন এক পর্যটক। কক্সবাজারের দরিয়ানাগর সৈকতে প্যারাসেইলিং করার সময় আকাশ থেকে ছিটকে সমুদ্রে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন অক্ষর শৌভিক রায় (৩০)। শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে। নিহত শৌভিক খুলনা সিটি করপোরেশনের বানিয়াখামার এলাকার বাসিন্দা শেখর রায়ের পুত্র।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রমতে, খুলনা থেকে নয়জন বন্ধু মিলে কক্সবাজার বেড়াতে এসেছিলেন শৌভিক। দুপুর ১২টার দিকে দরিয়ানাগর সমুদ্রসৈকতে পৌঁছে প্রায় ২ হাজার টাকার বিনিময়ে টিকিট কেটে তিনি প্যারাসেইলিংয়ের মাধ্যমে আকাশে ওড়ার প্রস্তুতি নেন। এরপর তাকে নিয়ে প্যারাসেইলিংটি প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ ফুট উপরে উঠলে হঠাৎ নিয়াে তিনি বঙ্গোপসাগরের পানিতে ছিটকে পড়েন। কিছুসময় পর প্যারাসেইলিং পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা তাকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে স্থানান্তরিত করলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

ঘটনার পর শৌভিকের এক সঙ্গী তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, দুর্ঘটনা ঠিক যেই মুহূর্তে ঘটে, তখন দ্রুত উদ্ধারের কোনো ববস্থাই ছিল না। দরিয়ানগর সৈকতে একটিও লাইফগার্ড ছিল না, এবং একটি স্পিডবোট যখন শৌভিককে উদ্ধার করে হাসপাতালের পথে রওনা দিয়েছে, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে 'স্যাটেলাইট ভিশন সি স্পোর্টস' নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দরিয়ানগর পয়েন্টে প্যারাসেইলিং পরিচালনা করে আসছে। অথচ প্রায়ই পর্যটকদের ছিটকে পড়ার ঘটনা ঘটলেও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে তেমন কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়নি। স্থানীয় লোকজন জানান, ২০২৫ সালের মে মাসে একজন পর্যটক প্যারাসেইলিং থেকে সাগরে পড়ে গুরুতর আত হন। ওই বছর ৩০ আগস্ট এক নারী পর্যটক ছিটকে সরাসরি ঝাউবাগানের গাছের ডগায় পড়ে দীর্ঘসময় আটকে ছিলেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসন সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বলেছিল। কিন্তু সম্প্রতি আবারো তা চালু হয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠান মালিক মোহাম্মদ ফরিদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি, ফোনেও যোগাযোগ করা যায়নি তার সাথে। কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ আলী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, পর্যটকের মরদেহ উদ্ধার করে হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে এবং বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে প্যারাসেইলিং পরিচালনার বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

জেলা প্রশাসক মো. আ মান্নানও নিশ্চিত করেন যে, তিন দিন আগ থেকেই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণ দরিয়ানগরসহ সব পয়েন্টে প্যারাসেইলিং নিষিদ্ধ ছিল। তিনি এ ঘটনাকে ‘দুঃখজনক’ আখ্যা দিয়ে জানান, প্রশাসনের নজর এড়িয়ে কীভাবে এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল তা খতিয়ে দেখা হবে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা তুলে ধরে সি-সেফ লাইফ গার্ডের সুপারভাইজার সিফাত সাইফুল্লাহ জানান, কলাতলী থেকে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার সৈকতে তাদের ২৭ জন লাইফগার্ড কাজ করলেও, কলাতলীর দক্ষিণের দরিয়ানগর, ইনানী, হিমছড়ি ও টেকনাফ পর্যন্ত ১১৫ কিলোমিটার বিস্তৃত সৈকতে কোনো উদ্ধারকর্মী বা ডুবুরি নেই।

কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্যসচিব নজরুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে প্যারাসেইলিং চালাচ্ছে। সেখানে প্রশিক্ষিত অপারেটর, আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা, উদ্ধার তরী ও প্রাথমিক চিকিৎসা কোনোটিই নেই। নিরাপত্তার মান যাচাই না হওয়া পর্যন্ত এই ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া উচিত।

এদিকে, এক পর্যটক প্যারাসেইলিং-এর চরিত্র সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, নৌযানের সঙ্গে বাঁধা মোটা দড়ির মাধ্যমে স্পিডবোটি প্যারাসেলকে সমুদ্রের দিকে টানে। আরোহীই নিজের ওঠানামা নিয়ন্ত্রণ করেন। অনেকেই উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ছিটকে পড়লেও দ্রুত উদ্ধারের অভাবে প্রাণহানির মত ঘটনাগুলি ঘটে।