সপ্তম শতকের মদিনায় এক বেনামি কোরাইশি নারী রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কুরআনের দলিল নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাবের খেলাফতকালে (৬৩৪-৬৪৪ খ্রি.) দেনমোহরের পরিমাণ এত বেড়ে গিয়েছিল যে সাধারণ পুরুষদের বিয়ে করা কঠিন হয়ে পড়ছিল। সমস্যা সমাধানে খলিবা মিম্বরে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দেন, কোনো নারী চারশ দিরহামের বেশি দেনমোহর দাবি করতে পারবেন না।

ঘোষণা শেষ হতে না হতেই এক নারী উঠে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন রাখেন। তিনি বলেন, হে আমিরুল মুমিনীন, কোনটি বেশি অনুসরণযোগ্য— আল্লাহর কিতাব নাকি আপনার ঘোষণা? জবাবে খলিফা বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহর কিতাব বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কেন এমন প্রশ্ন করছেন? তখন নারীটি সুরা নিসার ২০ নম্বর আয়াত তেলাওয়াত করেন, যেখানে আল্লাহ বলেছেন, যদি কোনো পুরুষ এক স্ত্রীর স্থলে অন্য স্ত্রী নেয় এবং আগের স্ত্রীকে অগাধ সম্পদও দিয়ে থাকে, তা থেকে কিছুই ফেরত নেওয়া যাবে না। নারীর যুক্তি ছিল, যখন আল্লাহ নিজেই বিপুল পরিমাণ দেনমোহর দেওয়ার বৈধতা দিয়েছেন, তখন রাষ্ট্র কীভাবে তার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করতে পারে?

এই কথার পর খলিফা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে যান। তারপর তিনি বিনয়ের সঙ্গে ভুল স্বীকার করে বলেন, একজন সাধারণ নারীর ধর্মীয় জ্ঞান (ফিকহ) ওমরের চেয়ে অনেক বেশি। অন্য বর্ণনায় নারীটি সত্য বলেছে এবং খলিফা ভুল করেছেন বলে উল্লেখ রয়েছে। তিনি আবার মিম্বরে উঠে নিজের আদেশ বাতিল করেন।

ইবনে কাসির, কুরতুবি, ইবনে আতিয়্যাহ, ফখরুদ্দিন আর-রাজি ও হাফেজ ইবনে কাসির—এমনকি কোনো ফকিহ বা মুফাসসির এই প্রতিবাদকে বেয়াদবি বলে উড়িয়ে দেননি। বরং সবাই একে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করে আইনি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে দেনমোহরের কোনো সর্বোচ্চ সীমা রাষ্ট্র বা সমাজ নির্ধারণ করতে পারে না। ইমাম রাজি আরও বলেন, দেনমোহর স্বামীর পক্ষ থেকে কোনো দয়া নয়, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে নারীর জন্য নির্ধারিত একটি বিশেষ অধিকার।

বর্তমান সমাজে দেনমোহর প্রহসনে পরিণত হয়েছে। কাবিননামায় লাখ টাকা লেখা হলেও বাস্তবে তা পরিশোধ করা হয় না, একে তালাকের জরিমানা হিসেবে দেখা হয়। অথচ ইসলামি বিধান অনুযায়ী এটি বিয়ের শুরুতেই নারীকে সম্মানের সঙ্গে পরিশোধ করার বাধ্যতামূলক দেনা। পৈত্রিক সম্পত্তি থেকে মেয়েরা বঞ্চিত হচ্ছেন, যে অধিকার চৌদ্দশ বছর আগে ওই নাম-না-জানা নারী খলিফার সামনে দাঁড়িয়ে আদায় করে গেছেন।

এই ঘটনার শিক্ষা নারীর সাহসের পাশাপাশি খলিফার প্রতিক্রিয়ায়। একজন প্রতাপশালী নেতা, অর্ধ-পৃথিবীর শাসক, একজন সাধারণ নারীর যুক্তির সামনে নিজের অহংকার সরিয়ে রেখে ভুল স্বীকার করতে এক সেকেন্ডও দ্বিধা করেননি। আজকের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্বে এই বুদ্ধিবৃত্তিক নম্রতা ও সমালোচনা সহ্য করার সক্ষমতা প্রায় অনুপস্থিত। সমাজ থেকে অন্যায় ও বৈষম্য দূর করতে খলিফা ওমরের ইনসাফ ও সেই নারীর ধর্মতাত্ত্বিক সচেতনতা দুটিই পুনরুজ্জীবিত করা প্রয়োজন।