চট্টগ্রাম নগরের সাধুরপাড়ায় অবস্থিত চান্দগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টির চিত্রটি চরম হতাশার। ১৯৯৫ সালে স্থানীয়দের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ও ২০১৩ সালে জাতীয়করণ করা এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি এখনো একটি স্থায়ী ভবনের জন্য অপেক্ষা করছে। আধা পাকা অবকাঠামোতে চলা এই বিদ্যালয়ের প্রধান সমস্যা বর্ষাকালে দৃশ্যমান হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, বিদ্যালয়টির একপাশে বিশাল একটি পুকুর, যার উচ্চতা এখন বিদ্যালয়ের মেঝের সমান। ফলে সামান্য বৃষ্টিপাত হলেই পানিগড়িয়ে পুকুরঘেঁষা সরু প্রবেশপথ ও শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে। সম্প্রতি একটানা বৃষ্টিতে তিন-চার দিন বিদ্যালয়ের কক্ষগুলো পানিতে নিমজ্জিত ছিল। সরেজমিনে দেখা গেছে, একটি কক্ষের মেঝেতে তখনও পানি জমে আছে, অপর কক্ষগুলোর মেঝে সম্পূর্ণ শুকায়নি। তিনটি শ্রেণিকক্ষেই দুই শতাধিক শিক্ষার্থীর পড়ালেখা চলছে, কিন্তু বর্ষাকালে এই কক্ষগুলোও অনেকসময় অকেজো হয়ে পড়ে।
শুধু শ্রেণিকক্ষ নয়, পুরো ভেৌত কাঠামোই জরাজীর্ণ। প্রতিষ্ঠানের মিলনায়তনের সামনের লোহার দরজায় মরিচা ধরেছে, তাতে তালা ঝুলছে। ভেতরে উঁকি দিলেই চোখে পরে একপাশে জন্ম নেওয়া আগাছা-ঝোপঝাড় ও অন্যপাশে ফেলে রাখা পুরানো টেবিল-বেঞ্চ। মশা-মাছির উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষকরা বাধ্য হয়ে দিনের বেলাতেও প্রতিটি কক্ষে মশার কয়েল জ্বালিয়ে পাঠদান করান।
বিদ্যালয়টিতে খেলার মাঠ, ওয়াশ ব্লক কিংবা শহীদ মিনার কিছুই গড়ে ওঠেনি। অনুমোদিত ছয়টি শিক্ষক পদের একটি দীর্ঘদিন শূন্য। প্রধান শিক্ষক কৃষ্ণা প্রভা দেবী জানান, ‘আগে বিদ্যালয়ভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনার (স্লিপ) বরাদ্দ থেকে টিনের চালা ও ছাউনি মেরামত হতো। এখন বরাদ্দ কমে যাওয়ায় প্রয়োজনীয় সংস্কারও অসম্ভব হয়ে পড়েছে।’
স্থানীয় কমল নাথের মতো বাসিন্দারা বিদ্যালয়টির সঙ্গে শুরু থেকেই সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক রাখলেও সরকারি সুযোগ-সুবিধার অভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও পড়ালেখার ব্যাঘাত নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগ বাড়ছে। এর ফলশ্রুতিতে, আশপাশের বিভিন্ন বেসরকারি স্কুল ও মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ায় সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থী সংখ্যা কমছের্।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফিরোজ আহাম্মদ পরিস্থিতি স্বীকার করে বলেন, ‘চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৪) শেষ হয়ে যাওয়ায় নতুন ভবনের কাজ এগোতে পারছ না। পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির (পিইডিপি-৫) অধীনে এই বিদ্যালয়কে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অনুমোদন পেলে ভবন নির্মাণের পথ খুলবে।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মুহম্মদ আমির উদ্দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে অভিভাবকদের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কারণ বিশ্লেষণ করে বলেন, ‘শুধু পাঠদান নয়, একটি বিদ্যালয়ের অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তির প্রাপ্যতা ও সার্বিক শিক্ষার পরিবেশে ঘাটতি থাকলে অভিভাবকরা আস্থা হারাবেনই। শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য প্রথমেই মৌলিক ভৌত কাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি।’




