তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের শেষ দিনটিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিরাপদে দেশ থেকে বের করে আনতে মার্কিন কর্মকর্তারা একটি অপ্রচলিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন। ৮ জুলাই সকালে তাঁর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় একটি উদ্বেগজনক গোয়েন্দা প্রতিবেদন। তাতে বলা হয়, ইরানি পক্ষ ট্রাম্প যে বিলাসবহুল হোটেলে অবস্থান করছিলেন এবং তাঁর মোটর শোভাযাত্রার চলাচলের পথ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত। এমনকি এয়ারফোর্স ওয়ান বিমানকে ভূপাতিত করার জন্য কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাব্য ছক কষা হচ্ছিল বলেও জানানো হয়।
এই তথ্য পাওয়ার পর সিক্রেট সার্ভিস ও হোয়াইট হাউসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা দ্রুত একটি গোপন কৌশল সাজান। সম্মেলনস্থলের নিরাপত্তা যদিও নজিরবিহীনভাবে কঠোর ছিল—হাজার হাজার তুর্কি নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন ছিল এবং বহুমাত্রিক নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হয়েছিল—তবু হুমকির গুরুত্ব উপেক্ষা করা হয়নি। কর্মকর্তারা দিনভর আঙ্কারার প্রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্সের ছোট কক্ষে বসে বিকল্প নিরাপত্তাব্যবস্থা খতিয়ে দেখেন। সময় ছিল অত্যন্ত সীমিত, কারণ ওই দিন সন্ধ্যায় ট্রাম্পের রওনা হওয়ার কথা ছিল।
মানসিকভাবে চাপের মুখে পড়ে ট্রাম্প নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দুই ঘণ্টা দেরিতে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হন। বিষণ্ন মুখে এবং বাঁ হাতে একটি ফোল্ডার ধরে তিনি সম্মেলনটিকে সফল বলে ঘোষণা করেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে যে প্রেসিডেন্টের জীবন অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং এটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ একটি পেশা। ন্যাটোর মহাসচিবের সঙ্গে সকালের বৈঠকেও তিনি মন্তব্য করেন, তিনি তাদের সব তালিকার শীর্ষে রয়েছেন এবং ভাগ্য সবসময় সহায় নাও থাকতে পারে।
এরপর ট্রাম্পের মোটর শোভাযাত্রা বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হয়। কিন্তু তিনি সরাসরি বড় উড়োজাহাজে চড়েননি। প্রথমে তাঁকে পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানে তোলা হয়। বিমানের মূল প্রবেশদ্বার দিয়ে ঢুকে দ্রুত হেঁটে অন্য পাশের বিকল্প বহির্গমন পথ দিয়ে বের করে নেওয়া হয় তাঁকে। সেখানে অপেক্ষা করছিল একটি সাদা রঙের ক্যাটারিং ট্রাক। তুর্কি এয়ারলাইনের খাবার পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হাইড্রোলিক ট্রাকটি সকালেই গোপনে মার্কিন কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছিল এবং ভেতরের বাক্সগুলো খালি করে রাখা হয়েছিল। ট্রাকে চড়েন ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী নাটালি হার্প, ওভাল অফিসের অপারেশন ডিরেক্টর ওয়াল্ট নাউটা, হোয়াইট হাউসের পার্সোনেল প্রধান ড্যান স্কাভিনো এবং কয়েকজন সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট। স্যুট পরা একজন এজেন্ট চালকের পাশে বসেন। মাত্র ১৬২ সেকেন্ডে টারমাক পেরিয়ে ট্রাকটি একটি অপেক্ষাকৃত ছোট সি-৩২এ সামরিক বিমানের পাশে গিয়ে থামে।
বড় উড়োজাহাজেই থেকে যান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এবং অন্যান্য জ্যেষ্ঠ সহযোগী—যাদের মধ্যে ছিলেন স্টিফেন মিলার, স্টিভেন চেং, উইল শার্ফ, মাইকেল নিধাম ও রিচার্ড ওয়াল্টার্স। তাঁদের অনেকেই জানতেন না যে ট্রাম্প আসলে সেই বিমানে নেই। পর্দা টেনে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরে যুক্তরাজ্যের মিল্ডেনহল বিমানঘাঁটির উদ্দেশে রওনা হওয়া সি-৩২এ বিমানে ট্রাম্পের সঙ্গে যোগ দেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ।
এই ছদ্মবেশের পেছনে ছিল একটি যৌক্তিক ব্যাখ্যা তৈরির চেষ্টা। ট্রাম্প যে ৪০ কোটি ডলার মূল্যের কাতার থেকে পাওয়া বোয়িং ৭৪৭-৮ উড়োজাহাজটি ব্যবহার করে তুরস্কে এসেছিলেন, সেটি কেন ফেরতযাত্রায় ব্যবহার করা হচ্ছে না—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে বলে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি লেখেন, নতুন উড়োজাহাজটি যুক্তরাজ্যের একটি ঘাঁটিতে পাঠানো হচ্ছে সেনাদের দেখার সুযোগ দেওয়ার জন্য। বাস্তবে তিনি পুরোনো বিমানে করে ফিরছেন বলেও উল্লেখ করেন। যদিও বাস্তবে তিনি কোনো উড়োজাহাজেই চড়েননি—ট্রাকের মাধ্যমে ছোট বিমানে পৌঁছান। তিনি সাংবাদিকদের কাছে পরে দাবি করেন, তাঁর প্রধান উড়োজাহাজটিই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ছিল, যদিও সেখানে তাঁর অনুপস্থিতি কেউ জানত না।
সাবেক সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট ও সিএনএনের বিশ্লেষক জনাথন ওয়াক্রো ব্যাখ্যা করেন, প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার জন্য এমন মেকি বা বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া নতুন কিছু নয়। যেমন ওয়াশিংটনে হেলিকপ্টারে ওঠার সময় তিনটি একই রকম হেলিকপ্টার আকাশে ওড়ে। নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, হুমকিটি এত গুরুতর ছিল যে চরম পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। তুরস্কের আকাশসীমা অতিক্রম না হওয়া পর্যন্ত দুটি বিমানের সুরক্ষার্থে যুদ্ধবিমানও মোতায়েন রাখা হয়েছিল। কোনো সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা না গেলেও এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রত্যক্ষ প্রমাণ না মিললেও, ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য ও পরবর্তী সতর্কতার ভিত্তিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। সিআইএর কিছু কর্মকর্তা যদিও তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন এবং ইরানের ক্ষমতা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন, তবু সতর্কতা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়।




