সরকারের শীর্ষমহলের ইচ্ছায় বিতর্কিত কেডিএস গ্রুপের কাছে আল-আরাফাহ্‌ইসলামী ব্যাংকের প্রশাসনিক ক্ষমতা আবারও হস্তান্তর করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই উদ্যোগের ফলে অতীতের অনিয়ম ও অনৈতিক কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত একাধিক ব্যক্তি নতুন পরিচালনা পর্ষদে জায়গা করে নিতে পেরেছেন। কিন্তু নিয়োগের মাত্র দুদিনের মধ্যেই চাপের মুখে দুজন পরিচালককে সরিয়ে দিতে হয়। সর্বশেষ পর্ষদ পুনর্গঠনে চট্টগ্রামের প্রভাবশালী কেডিএস গ্রুপের মূল নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। উল্লেখ্য, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই গ্রুপটিই আল-আরাফাহ্‌ইসলামী ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংক— দুইটিতেই বিতর্কিত এস আলম সমষ্টির সাথে যৌথভাবে কর্তৃত্বে ছিল।

পুনর্গঠনের পর নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান বদিউর রহমান স্পষ্ট জানান, দীর্ঘদিন পত ফিরে মূল দায়িত্ব হলো পেশাদারির সাথে ব্যাংক পরিচালনা করা, যাতে কোনো অনিয়মের সুযোগ না থাকে। তিনি এও বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগে যাঁরা চাকরি হারিয়েছেন তাঁদের প্রত্যাবর্তনের কোনো সুযোগ নেই, কারণ তা ব্যাংককে চরম ঝুঁকির দিকে ঠেলে দেবে। চেয়ারম্যান হিসেবে আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষাকেই তিনি প্রধান কর্তব্য হিসেবে দেখছেন।

কিন্তু তার এই বক্তব্যের বিপরীত চিত্রই দেখা গেছে পর্ষদ গঠনের পরপরই। নবনিযুক্ত কয়েকজন পরিচালক নানাবিধ অনিয়মের দায়ে আগে চাকরিচ্যুত ও অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের পুনরায় ব্যাংকে ফিরিয়ে আনার তৎপরতা শুরু করেছেন। এতদসত্ত্বেও, নবগঠিত পর্ষদের প্রথথম সভাতেই ওই বিতর্কিত কর্মকর্তাদের একটি অংশকে উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে। এরই পাশাপাশি, নতুন পর্ষদের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর ব্যাংকটির একজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি)-কে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে ব্যাংকের সাধারণ কর্মচারীদের মধ্যে নতুন করে ভীতি ও অস্থিরতা দানা বেঁধেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক যে ১৪ জন অংশীদারকে পরিচালনার জন্য মনোনীত করেছে, তাদের মাঝে ছয়জনই সরাসরি কেডিএস গ্রুপের শীর্ষ পরিচালনা বা তাঁদের আত্মীয়। এরা হলেন কেডিএসের প্রধান খলিলুর রহমান, তার পুত্র সেলিম রহমান, তার ভাই আহমেদুল হক, কেডিএস গার্মেন্টসের প্রতিনিধি মাহবুব আহমেদ, কেডিএস টেক্সটাইলের প্রতিনিধি ফরিদ উদ্দিন আহমেদ এবং কেওয়াই স্টিল মিলসের প্রতিনিধি মোহাম্মদ শরিফ উদ্দিন তসলিম। একই পরিবার বা গ্রুপের তিনজনের বেশিঃ পরিচালক থাকতে পারে না— ব্যাংক কোম্পানি আইনের এই বিধান লঙ্ঘিত হওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশে ফরিদ উদ্দিন আহমেদ ও শরিফ উদ্দিন তসলিম শেষ পর্যন্ত পদ গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকেন।

পর্ষদ পুনর্গঠনের পরদিন অনুষ্ঠিত জরুরি সভায় চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন বদিউর রহমান ও নির্বাহী কমিটির প্রধান মনোনীত হন কেডিএসের সেলিম রহমান। সভায় চাকরিচ্যুত শাহেদ সিদ্দিকীসহ একাধিক ব্যক্তির উপস্থিতি এবং নির্ধারিত সীমার চেয়ে বহুগুণ বেশি লোকের অংশগ্রহণে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্বতন্ত্র পরিচালকেরা এ সময়ে নীরব অবস্থান নেন। ব্যাংক সূত্রগুলো জানায়, গত দুই বছরে যেসব কর্মকর্তা চাকুরিচ্যুত হয়েছেন, তারা ফিরে আসার জন্য ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করছেন। পাশাপাশি সম্প্রতি নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের বিভিন্নভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে এবং উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ হোসেন তাদের নির্দেশেই চাকরি ছেড়েছেন বলে অভিযোগ। তবে চেয়ারম্যান বদিউর রহমান দাবি করেছেন, ডিএমডি তার নিজের অভিপ্রায়ে পদত্যাগ করেছেন।

আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান কেপিএমজি এবং ব্যাংকের নিজস্ব তদন্তে আল-আরাফাহ্‌এর সাবেক দুই চেয়ারম্যানের অনিয়মের বিষয়ে তথ্য উঠে আসে। তাদের মধ্যে একজন বর্তমান নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান সেলিম রহমান। পর্ষদের এক কোটি টাকার অনুমতি উপেক্ষ করে তার জন্য ২ কোটি ২৩ লাখ টাকার বিলাসবহুল মার্সিডিজ বেঞ্জ কেনা হয়। একইভাবে, সাবেক চেয়ারম্যান ও এস আলমের সহোদর আবদুস সামাদ লাবুর জন্য কোনো রকম সম্মতি ছাড়াই ৩ কোটি ২৩ লাখ টাকার গাড়ি কেনা হয়। গাড়ি দুটির হিসাব গোপন করতত সাবসিডিয়ারি কোম্পানির নামে নিবন্ধন করে লেনদেন চালানো হয়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আপত্তির প্রেক্ষিতে গাড়িগুলো ব্যাংকের জিম্মায় নেওয়া হয়েছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চলছে।

১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত আল-আরাহা ইসলামী ব্যাংকের আমানতের পরিমাণ ৫৪ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, অন্যদিকে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে মোট ঋণের ১৭.৬১ শতাংশে। টানা লভ্যাংশ দিতে না পারায় শেয়ারবাজারে এর ক্যাটাগরি 'জেড'-এ নেমে গেছে। সারাদেশে এর শাখা ২২৬টি এবং কর্মীসংখ্যা সাড়ে পাঁচ হাজারের ওপর। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা নামপ্রকাশ না করার শর্তে মন্তব্য করেছেন যে, শীর্ষমহলের চাপে বাধ্য হয়েই ব্যাংকটিকে একটিমাত্র গ্রুপের কাছে সমর্পণ করা হয়েছে, যা একটি নেতিবাচক সূচনা। সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী সতর্ক করে বলেন, অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করে পরিচালক নির্ধারণ না করলে এবং কেউ প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করতে না পারলে তা জাতির জন্য দুর্ভাগ্য বয়ে আনবে।