ইতালির রাজধানী রোমের টারমিনি স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় পরিত্যক্ত ও দখলকৃত ‘স্পিন টাইম’ ভবন থেকে উচ্ছেদের পর প্রায় তিন শতাধিক মানুষ এখন চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিন পার করছেন। প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের কারণে সেখানে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে। ভবনটির বাসিন্দাদের দাবি, তাঁদের হৃদয় টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। আশপাশে অবস্থান নেওয়া এসব মানুষের মধ্যে অন্তত শতাধিক শিশু রয়েছে। গত ২৯ জুলাই ভবনটির নিচ তলায় সামান্য অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিস আসার আগেই বাসিন্দারা আগুন নিভিয়ে ফেললেও, এর পরপরই পুলিশ এসে ভবনটি খালি করে দেয়। ম্যাজিস্ট্রেট ভবনটিকে বিচারিক জিম্মায় নিয়ে বসবাসের অযোগ্য ঘোষণা করেন। এরপর থেকে বাসিন্দাদের ফুটপাতেই থাকতে হচ্ছে। শুধু প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও জিনিসপত্র আনতে পুলিশের তত্ত্বাবধানে একে একে ভবনে ঢোকার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
উচ্ছেদের পর থেকে স্বেচ্ছাসেবকদের তৎপরতায় আশপাশের এলাকা থেকে খাবার, পানি ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সংগ্রহ করে আনা হচ্ছে। গত নয় দিনে বহু রাজনীতিক, শিল্পী ও সাধারণ মানুষ এসব বাসিন্দার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। অস্থায়ী শিবিরে থাকা শিশুদের জন্য সন্ধ্যায় খোলা আকাশের নিচে সিনেমা প্রদর্শনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। ১১ বছর ধরে ভবনটিতে বসবাস করা মারিয়া ক্যাবরেরা জানান, প্রথম রাতে অনেকের পায়ে জুতো পর্যন্ত ছিল না। ভোর ৪টায় তাঁদের জানিয়ে দেওয়া হয়, ভবনে আর ফেরা যাবে না। তিনি আরও বলেন, কেউ কেউ ৪০ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে কাটিয়েছেন এবং ময়লার ঝুড়ি থেকে কুড়ানো কার্ডবোর্ডের ওপর শিশুদের শুয়ে থাকতে দেখাটা ভয়ংকর ছিল। গত ৬ আগস্ট রেডক্রসের একজন নার্সের কোলে দুই বছর বয়সী এক শিশুকন্যা অজ্ঞান হয়ে যায়। ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করা এক কুর্দি বাসিন্দা জানান, তিনি দুই ঘণ্টা ধরে কেঁদেছেন। তাঁর অন্ধ ও হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ভাইকে এখন প্রখর রোদে বসে থাকতে হচ্ছে।
২০২১ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেলজয়ী জর্জিও পারিসি গত শুক্রবার দুর্দশাগ্রস্ত বাসিন্দাদের একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, বৈষম্য ও সমাজের কিছু মানুষকে মূলধারা থেকে দূরে ঠেলে দেওয়া গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। যাঁরা এর বিরুদ্ধে লড়াই করছেন, সবাইকে কেবল কথায় নয়, কাজেও তাঁদের পাশে দাঁড়ানো উচিত। উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে প্রথম দখল হওয়া ভবনটিতে ২০টির বেশি দেশের ১৪০টি পরিবার বাস করত। ‘বাসস্থান একটি মৌলিক অধিকার’ এই ধারণা থেকে তাঁরা ভবনটিতে বসবাস শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি একটি বড় সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। ৩০ বছরের কম বয়সীদের সম্পাদনায় এখান থেকে একটি পত্রিকাও প্রকাশিত হতো এবং নিয়মিত কনসার্ট ও নাটকের আয়োজন করা হতো।
গত ৩ আগস্ট রোমের প্রশাসনিক প্রধান একটি বৈঠক ডেকে ভবনটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ‘ইনভেস্টিআরই এসজিআর’ ফান্ডের কাছে ভবনটি কেনার প্রস্তাব দেন। বিক্রির প্রক্রিয়া চলাকালীন অন্তর্বর্তী ব্যবস্থায় বাসিন্দাদের ফেরানোর কথাও বলা হয়। তবে বৃহস্পতিবার আরেকটি বৈঠকের পর মেয়র রবার্তো গুয়ালতিয়েরি টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ঘোষণায় জানান, প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। ইনভেস্টিআরই এসজিআর এক বিবৃতিতে জানায়, ১৩ বছরের দখলদারির কারণে ভবনটিতে নিরাপত্তার মানদণ্ড বজায় নেই, তাই আইনিভাবে দখল হস্তান্তর সম্ভব নয়। তবে বিক্রির বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে আগ্রহী তারা। মেয়র জানিয়েছেন, সোমবার থেকে বাসিন্দাদের বিকল্প বাসস্থানে সরিয়ে নেওয়া হবে। অন্যদিকে, অধিকারকর্মীরা বলছেন, স্থানীয় সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগে তারা যত দিন সম্ভব অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন। ভবনটির তত্ত্বাবধায়ক কর্তৃপক্ষের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা সেখানে একটি বিলাসবহুল হোটেল নির্মাণের। ক্ষমতাসীন ডানপন্থী দল ‘ব্রাদার্স অব ইতালি’ ভবনটি না কেনার জন্য মেয়রের ওপর চাপ প্রয়োগ করেছে। তাদের অভিমত, জনগণের অর্থ বেআইনি কাজকে পুরস্কৃত করার শামিল।
এদিকে, ভ্যাটিকান সিটি পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। পোপ লিও চতুর্দশ সম্প্রতি ওই সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং কার্ডিনাল রেইনা জানিয়েছেন, পোপ প্রতি মুহূর্তের পরিস্থিতি জানতে চেয়েছেন। উচ্ছেদ স্থায়ী হলে এটি ইতালির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় উচ্ছেদ হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাসিন্দা অরোরা জ্যাকব পপুলিস্ট রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনা করে বলেন, জরুরি অবস্থাকে কেউ কেউ নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগিয়েছে এবং পরিবার ও শিশুদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ঘরছাড়া করেছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, তাঁদের সঙ্গে সাধারণ নাগরিকদের পার্থক্য শুধু এই যে তাঁরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। মারিয়া ক্যাবরেরা বলেন, তিনি একটি অলৌকিক ঘটনা চান এবং গরিব হওয়াটা কোনো অপরাধ নয়। তাঁর মতে, যাঁদের সাহায্য প্রয়োজন, তাঁদের নিয়ে কর্তৃপক্ষের খেলা বন্ধ করা উচিত এবং মালিকদের উচিত ভবনটি বিক্রি করে দেওয়া। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, কঠিন সময়ে থাকা মানুষের দুর্দশা আর একটি ভবনের দাম নিয়ে সবাই শুধু ফায়দা লোটার খেলায় মেতেছে। ‘স্পিন টাইম’ বিলাসবহুল না হলেও তাঁদের কাছে এটি ঘর, এবং তাঁরা সেখানেই ফিরে যেতে চান বলে জানান ক্যাবরেরা।




