সপ্তাহের ছুটির দিনেও মারারা স্টেডিয়ামের গ্যালারি ছিল প্রায় শূন্য। তবু সেখানে উপস্থিত অল্প সংখ্যক দর্শকের বড় একটি অংশ ছিলেন প্রবাসী বাংলাদেশি। ডারউইনের পাশাপাশি সিডনি ও ব্রিসবেন থেকে আসা এসব সমর্থক পুরো সময় সম্ভাব্য জয়ের আনন্দে খেলা উপভোগ করেন। অবশেষে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের সাক্ষী হয়ে ফিরলেন তাঁরা।

তাদের মধ্যে ছিলেন ডেটা সায়েন্সে মাস্টার্স করতে অস্ট্রেলিয়ায় আসা তরুণ আল মাশরুক ভূঁইয়া। দেড় বছর ধরে দেশ ছেড়ে থাকার পরও দেশের আবেগকে সামনাসামনি দেখার সুযোগকে তিনি সৌভাগ্য হিসেবে উল্লেখ করেন। বাংলাদেশের এমন সাফল্যকে তিনি ‘ব্যতিক্রমধর্মী অভিজ্ঞতা’ আখ্যা দেন। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন পর অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের খেলা—তাও আবার ডারউইনে—দেখার সুযোগ তাঁদের জন্য রোমাঞ্চকর। দেশের মাটিতে সিরিজ জয়ের আত্মবিশ্বাস এখানে আরও জোরালো হয়েছে বলেও জানান তিনি।

সিডনি থেকে তিন দিন খেলা দেখতে আসা সরুদ্দিনের কথায়ও ছিল গভীর আবেগ। তিনি জানান, জয়ের সম্ভাবনা দেখে ফ্লাইট বাতিল করে রাত কাটিয়েছেন ডারউইনে। তাঁর পরিকল্পনা ছিল, ফলাফল হলে সারাদিন জয় উদযাপন করে পরে সিডনিতে ফেরা।

ডারউইনের সিআইএম ইনস্টিটিউটে পড়াশোনা করা চট্টগ্রামের তরুণ জিসান দল বেঁধে খেলা দেখতে এসেছিলেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশের খেলা দেখে গর্বিত বোধ করছেন। এমনকি অস্ট্রেলিয়ানরাও দলের প্রশংসা করছেন, যা তাদের কাছে অপ্রত্যাশিত। এদিকে ১৯৯৯ সাল থেকে ডারউইনে বসবাসরত একটি পরিবারও মাঠে উপস্থিত ছিল। পরিবারের কর্তা সদরুদ্দিন জানান, ২০০৩ ও ২০০৮ সালেও তিনি বাংলাদেশের খেলা দেখতে এসেছিলেন। এবার ২৩ বছর পর আবার একই মাঠে বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়ার লড়াই দেখতে পেয়ে তাঁর স্ত্রীসহ পরিবারের সবাই আনন্দিত। বাংলাদেশের ভালো খেলা তাঁদের জন্য বড় গর্বের বিষয়।

মাঠে বাংলাদেশের খেলা দেখতে এসে প্রবাসীরা যেন পুনর্মিলনীর আনন্দই পেলেন। কেউ কেউ মন্তব্য করেন, ঈদের পর আজ আরও একটি আনন্দের দিন পেলেন তাঁরা।

অন্যদিকে দিনটি অস্ট্রেলিয়ানদের জন্য ছিল হতাশাজনক। বাংলাদেশের জয়ে অকৃপণভাবে অভিনন্দন জানালেও তাদের মুখ ছিল অন্ধকার। এই হতাশা আরও স্পষ্ট হলো মারারা স্টেডিয়ামের প্রিমিয়াম এক্সপেরিয়েন্স লাউঞ্জে। সাধারণত টেস্টের অন্যান্য দিনে বিলাসবহুল এই লাউঞ্জে সাবেক ক্রিকেটার, কর্মকর্তা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে বুফে খাবার ও পানীয়ের আয়োজন থাকত। কিন্তু আজ সেখানে কিছুই ছিল না—পুরো লাউঞ্জই খালি। একজন কর্মী ব্যাখ্যা দেন, চতুর্থ দিন খেলা হবে না ধরে নিয়ে কেউ প্রিমিয়াম টিকিট কাটেনি। শেষ পর্যন্ত টেস্ট চতুর্থ দিনে গড়ালেও অস্ট্রেলিয়ার শোচনীয় অবস্থার কারণে নতুন টিকিট বিক্রি হয়নি। তাই স্টেডিয়াম কর্তৃপক্ষ আগেই জানিয়েছিল, আজ লাউঞ্জ বন্ধ থাকবে।

ম্যাচ শেষে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারদের মুখে ছিল গ্লানি। কেউ টিম বাসে, কেউ ব্যক্তিগত গাড়িতে চড়ে স্টেডিয়াম ছাড়েন। বাংলাদেশ দলের সদস্যরা অবশ্য একসঙ্গে টিম বাসে উঠলেন। বাস ছাড়ার আগে ভেতরে কেউ একজন সবার উদ্দেশে বললেন, মোবাইলে থাকা সব ছবি যেন সবাই দিয়ে দেন। এমন একটি জয়ের স্মৃতি ক্রিকেটাররা কখনো হারাতে চাইবেন না, তা স্বাভাবিক। যারা মাঠে থেকে সাক্ষী হলেন, তারাও ফিরলেন অমূল্য স্মৃতি নিয়ে। অস্ট্রেলিয়াকে ‘তুলাধোনা’র মোড়কে অনেক বছর গল্প করার মতো একটি জয় এটি।