যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপের উত্তেজনা যখন তুঙ্গে, তখন দেশটির আরেক প্রান্তে ঘটে গেছে এক অসাধারণ ঘটনা। টেলিভিশনের পর্দায় ফুটবলার সেজে অভিনয় করা এক অভিনেতা এবার সত্যিকারের মাঠে নামলেন। গতকাল এল পাসো লোকোমোতিভের জার্সি গায়ে চাপিয়ে অভিষেকও সম্পন্ন করেছেন তিনি।
‘টেড ল্যাসো’ সিরিজের ভক্তদের কাছে ড্যানি রোহাস নামটি যেন আবেগেরই একটি অংশ। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইংল্যান্ডে গিয়ে নিজেকে প্রমাণের চেষ্টায় নামা এক কোচের গল্প নিয়ে নির্মিত এই সিরিজটি ফুটবলপ্রেমীদের মনে দাগ কেটেছিল। রিচমন্ডের মতো একটি ছোট দলকে প্রিমিয়ার লিগ পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার আন্ডারডগ গল্প প্রথমবারের মতো এত সুন্দরভাবে টিভি পর্দায় ফুটে উঠেছিল। তিনটি সিজনেই দর্শকদের মন জয় করে নিয়েছিল এই সিরিজ।
সেই সিরিজেই দর্শকদের সঙ্গে পরিচয় হয় ড্যানি রোহাসের — মেক্সিকো থেকে আসা এক প্রাণোচ্ছল তরুণ ফুটবলার, যিনি মাঠে যেমন প্রতিপক্ষকে ছাড় দেন না, তেমনই মাঠের বাইরে তার হাস্যোজ্জ্বল ব্যবহার সবার মন জয় করে নেয়। এই চরিত্রে অভিনয় করা ক্রিস্টো ফার্নান্দেজের খেলার দৃশ্যগুলো দেখে অনেকেই মন্তব্য করেছিলেন, তাঁর অভিনয় নয়, যেন বাস্তবেই ফুটবল খেলছেন তিনি। দর্শকদের সেই ধারণা মোটেও ভুল ছিল না।
অভিনয়ে আসার আগে ক্রিস্টো সত্যিকারের ফুটবলারই ছিলেন। যুব পর্যায়ে খেলেছেন, পুয়ের্তো রিকোর একটি ক্লাবের মূল দলেও জায়গা হয়েছিল তাঁর। কিন্তু হাঁটুর গুরুতর চোটই তাঁর ফুটবল জীবন থামিয়ে দেয়। বাধ্য হয়েই খেলার জগৎ ছেড়ে তিনি মন দেন অভিনয়ে। ২০১৬ সালে হলিউডে পা রাখা ক্রিস্টো নিজের ক্যারিয়ারের সেরা পরিচয় পান ‘টেড ল্যাসো’ সিরিজে। মজার ব্যাপার হলো, এই সিরিজের গল্প যেন তাঁর নিজের জীবনকেই অনুসরণ করেছিল — চোট থেকে ফেরা এক ফুটবলারের গল্প। তবে পর্দায় চোট থেকে ফিরলেও বাস্তবে তাঁর ফেরা হচ্ছিল না।
তবুও স্বপ্নটা বাঁচিয়ে রেখেছিলেন তিনি। গত এক দশকে ‘স্পাইডার-ম্যান: নো ওয়ে হোম’, ‘ট্রান্সফরমার্স’, ‘সোনিক দ্যা হেজহগ’, ‘ভেনোম’-এর মতো বড় বড় সিনেমায় অভিনয় করেছেন। পাশাপাশি ‘টেড ল্যাসো’ সিরিজ তো ছিলই। বড় পর্দায় একের পর এক সাফল্যের পরও যেন মনের ভেতরে খেলা করে যেত ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা।
২০২৬ সালের শুরুর দিকে সেই ভালোবাসার টানেই আবারও ফুটবলে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। প্রথমে মেজর লিগ সকারের শিকাগো ফায়ারে ট্রায়াল দেন, কিন্তু তাদের মন জয় করতে পারেননি। হতাশ না হয়ে দ্বিতীয় বিভাগের দল এল পাসো লোকোমোতিভে যোগ দেন। সেখানে নিজের দক্ষতা দেখিয়ে সবার নজর কাড়েন তিনি। একটি প্রীতি ম্যাচে ৩০ মিনিট খেলেই মুগ্ধ করে দেন দল পরিচালনাকে। এরপর গত ১১ জুলাই ইউএসএল কাপের ম্যাচে আনুষ্ঠানিক অভিষেক হয় তাঁর। নিউ মেক্সিকোর বিপক্ষে ম্যাচের ৭৯তম মিনিটে মাঠে নামেন ক্রিস্টো। মাত্র ১১ মিনিটে তেমন কিছু করতে না পারলেও নিজের স্বপ্ন পূরণের আনন্দই তাঁর কাছে বড় হয়ে আছে।
৩৫ বছর বয়সে এসে ক্রিস্টো ফার্নান্দেজ প্রমাণ করেছেন, স্বপ্ন বিক্রি না করে বেঁচে থাকলে কোনো দিন না কোনো দিন তা পূরণ হবেই। এখন তাঁর লক্ষ্য দলকে প্রথম বিভাগে তুলে আনা। তাঁর এই ফেরা আগামী দিনে কতদূর এগোয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।




