রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) আয়োজিত এক সেমিনারে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন মন্তব্য করেছেন, বর্তমান সময়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার চেয়েও ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে অপতথ্য ও বিকৃত তথ্যের বিস্তার। রোববার অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ আয়োজিত 'রাজনীতি, ক্ষমতা ও সাংবাদিকতার আন্তঃসংশ্লেষ: তত্ত্ব, বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ' শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে তথ্যমন্ত্রী বলেন, একদা তথ্যের ঘাটতি ছিল বড় সমস্যা, এখন তথ্যের অতিরিক্ত প্রবাহই সবচেয়ে জটিল ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এই অতিপ্রবাহের কারণে পরিকল্পিতভাবে অপতথ্য ছড়িয়ে জনমানস ও নির্বাচনী আচরণকে প্রভাবিত করার সুযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আধুনিক রাজনীতির নতুন বাস্তবতা। সরকার আধুনিক প্রযুক্তি, শিক্ষা ও কৌশলের সমন্বয়ে এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে তথ্যমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পালাবদলের সময় পক্ষ-বিপক্ষের সাংবাদিকতা দেখা যায়। জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহেও তৎকালীন সরকারকে টিকিয়ে রাখার পক্ষে গণমাধ্যমের একাংশ কাজ করেছে। তিনি মন্তব্য করেন, ইতিহাসের মোড় অন্যদিকে ঘুরলে বিজয়ী বয়ানের বদলে ভিন্ন ভাষ্য প্রতিষ্ঠিত হতো এবং সে ভাষ্য সমর্থনের জন্যেও বুদ্ধিজীবী বা সাংবাদিকের অভাব হতো না।
সাধারণ সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তাহীনতার কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, সম্পাদকদের তুলনায় মাঠের সাংবাদিকেরা অনেক বেশি অনিরাপদ পরিবেশে দায়িত্ব পালন করেন। গণমাধ্যমে যোগদানের নীতিমালা শিথিল থাকায় নানা অনিয়ম সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি সাংবাদিকদের ওয়েজ বোর্ডের আওতাভুক্ত করে আর্থিক ও পেশাগত মর্যাদা সুনিশ্চিতকরণে পূর্বে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
বাক্স্বাধীনতার বিষয়ে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ব্যক্তি নিজস্ব দার্শনিক ও আদর্শিক অবস্থান থেকে মতামত দেন বলে এর সীমা নির্ধারণ সহজ নয়। তবে একটি গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড জরুরি এবং সরকার তা এককভাবে নয়, সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে আগ্রহী। তিনি জানান, ক্ষমতা, স্বাধীনতা ও দায়িত্বের সমন্বয়ে একটি গণমাধ্যম কমিশন গঠনের উদ্যোগ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং কমিশন গঠনের আগে অংশীজনদের সাথে আলোচনা প্রায় শেষ।
সেমিনারে বিশেষ অতিথির ভাষণে ঢাবির উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, সাংবাদিকতা হতে হবে পেশাদার ও প্রশিক্ষিত মানুষের কাজ। লেখনীর মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তন সম্ভব, কিন্তু সেই সাংবাদিকতা হতে হবে সত্যনিষ্ঠ, বস্তুনিষ্ঠ ও হলুদ সাংবাদিকতামুক্ত।
মুখ্য আলোচক দৈনিক নিউ এজের সম্পাদক নূরুল কবীর সাংবাদিকতার দায়িত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, কেবল তথ্য সরবরাহ করাই নয়, বরং তথ্য বিশ্লেষণ করে সমাজে বিদ্যমান শোষণ, বৈষম্য ও ক্ষমতার কাঠামো সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করাও দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে বাক্স্বাধীনতার পথে এখনো বাধা হিসেবে টিকে থাকা ঔপনিবেশিক আমলের আইনের সমালোচনা করেন তথ্যমন্ত্রী।
উপস্থিত আলোকচিত্রী শহিদুল আলম মন্তব্য করেন, সাংবাদিকতার পথে যত সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতা আছে, সেগুলোই পেশাটির প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালো করে। সবকিছু ঠিকঠাক চললে সাংবাদিকের দরকারই পড়ত না। তাই প্রতিকূলতাকালেও সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখতে হবে। সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানের সভাপতিত্বে এবং অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌসের সঞ্চালনায় এতে বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।


