দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাশিত নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এবার দৃশ্যমান হতে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কমিটির কাজ শেষ পর্যায়ে; দ্রুতই তা মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গতকাল বুধবার সচিবালয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
মন্ত্রিসভায় অনুমোদন লাভ করলেই প্রজ্ঞাপন জারির কার্যক্রম শুরু হবে বলে ইঙ্গিত দেন মন্ত্রী। এর আগে, গত ২১ এপ্রিল নতুন বেতন বাস্তবায়নের সুপারিশ করতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে একটি ১০ সদস্যের কমিটি গঠিত হয়। অর্থ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, কমিটি তাদের সুপারিশ চূড়ান্তের পথে রয়েছে। কমিটির অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, অর্থ সচিব, জনপ্রশাসন সচিব এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসারসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা।
এক যুগ পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার ২৩ সদস্যের নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে এই কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তার প্রতিবেদন জমা দেয়। কমিশনের সুপারিশে বর্তমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর কথা বলা হয়। এর আওতায় সর্বনিম্ন মূল বেতন বিদ্যমান ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ নির্ধারিত বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়। কমিশনের হিসেব অনুযায়ী, প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর পেছনে বর্তমানে বার্ষিক ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও নতুন কাঠামো চালু করতে আরও ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হবে।
এই সুপারিশ বাস্তবায়ন পরিকল্পনা তৈরির জন্য গঠিত নাসিমুল গনি কমিটি প্রাথমিকভাবে দুই অর্থবছরে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের একটি খসড়া তৈরি করে। শেষ পর্যন্ত চলতি অর্থবছরে মৌলিক বেতন এবং পরবর্তী অর্থবছরে ভাতা দেওয়ার পক্ষে সদস্যরা একমত হন।
এদিকে, গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ করার সময় অর্থমন্ত্রী ঘোষণা দেন যে, ১ জুলাই থেকেই নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে। বাজেট বক্তৃতায় তিনি যুক্তি দেখান, এক দশকের অধিক সময় ধরে সরকারি চাকুরেরা একই কাঠামোতে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন, আর এই সময়ে মুদ্রাস্ফীতির চাপে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়ে গেছে। প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বেতন ও ভাতা বাবদ ৮৯,৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে, যা আগের সংশোধিত বাজেটের চেয়ে বিশেষ নয়। তবে, ‘জনপ্রশাসন-নিট’ খাতে বরাদ্দ ৫৪,৫৭২ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে, যার সিংহভাগই বেতন সমন্বয়, এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও পেনশনভোগীদের জন্য রাখা হয়েছে।
অপর এক প্রসঙ্গে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইকেএফ) একটি প্রতিনিধি দল ১২ থেকে ১৬ জুলাই ঢাকায় সফর করে অর্থমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্টদের সাথে বৈঠক করে। তারা রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড চালু এবং নতুন বেতন বাস্তবায়নের জন্য অর্থের উৎস সম্পর্কে জানতে চায়। যদিও আগের ৫৫০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি পাঁচ কিস্তি নেওয়ার পর থমকে গেছে, বর্তমানে সংস্থাটির সাথে ৪০০ কোটি ডলারের বেশি একটি নতুন ঋণ কর্মসূচির আলোচনা চলমান। আগামী অক্টোবরে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সমাবেশে এ বিষয়ে আরও আলোচনার সম্ভাবনা আছে।
নতুন বেতনের সঙ্গে আইকেএফের ঋণ পাওয়ার সম্পর্ক আছে কি না, জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী সুস্পষ্ট উত্তর দেন, ‘আইকমএফের ঋণের সঙ্গে নতুন বেতনকাঠামোর কোনো সম্পর্ক নেই। কাজ চলছে। বেতনকাঠামো হবে এবং প্রজ্ঞাপন জারি হতে বেশি সময় লাগবে না।’ তিনি আরও যোগ করেন যে, দুই দিন পর পর এ বিষয়ে কিছু বলতে চান না এবং শেষ পর্যন্ত একবারেই পুরো বিষয়ে কথা বলবেন। অর্থ বিভাগের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রও নিশ্চিত করে যে, বেতন বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে আইএমএফ সরাসরি কিছু বলে না বা বলার অধিকারেরও রাখে না; বরং তারা এর জন্য অর্থের উৎস সম্পর্কে জানতে চেয়েছে এবং রাজস্ব বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে।




