বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় বৈজ্ঞানিক ধ্রুবকের গুরুত্ব অপরিসীম। বিভিন্ন তত্ত্ব ও সমীকরণের সমাধানে এই ধ্রুবকগুলো নিয়মিত ব্যবহৃত হয়। রসায়নের সবচেয়ে পরিচিত ধ্রুবকগুলোর মধ্যে একটি হলো অ্যাভোগেড্রো সংখ্যা, যা NA বা L প্রতীক দিয়ে প্রকাশ করা হয়। কিন্তু মজার বিষয় হলো, ইতালীয় বিজ্ঞানী অ্যামেদিও অ্যাভোগেড্রো নিজে এই সংখ্যা আবিষ্কার করেননি; বরং তিনি ১৮১১ সালে একটি প্রকল্পে ধারণাটি উপস্থাপন করেন। সেই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীকালে এই ধ্রুবকের মান নির্ণয় করা হয়।
১৮৬৫ সালে অস্ট্রিয়ার রসায়ন শিক্ষক জোসেফ লসমিডট সর্বপ্রথম এই ধ্রুবকের মান পরিমাপ করেন। তবে অ্যাভোগেড্রো এই সাফল্য দেখে যেতে পারেননি, কারণ তাঁর মৃত্যু হয়েছিল ১৮৫৬ সালে। তাঁর অবদানকে সম্মান জানাতে ফরাসি পদার্থবিদ জিয়ান পেরিন ধ্রুবকটির নাম 'অ্যাভোগেড্রো সংখ্যা' রাখার প্রস্তাব দেন, যা পরবর্তীতে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।
অ্যাভোগেড্রো তাঁর প্রকল্পে বলেছিলেন, স্থির তাপমাত্রা ও চাপে কোনো গ্যাসের আয়তন ওই গ্যাসের অণু বা পরমাণুর সংখ্যার সমানুপাতিক হয়। এই ক্ষেত্রে গ্যাসের প্রকৃতির কোনো প্রভাব থাকে না। এমনকি আয়তন নির্দিষ্ট থাকলে প্রতিটি গ্যাসে সমান সংখ্যক অণু বা পরমাণু থাকবে। কিন্তু সেই সংখ্যা কত, তা তিনি নির্ধারণ করতে পারেননি। ফলে অনেকে তাঁর এই তত্ত্বকে মনগড়া বলে উপহাস করত।
অ্যাভোগেড্রোর মৃত্যুর পর বিজ্ঞানীরা তাঁর প্রকল্প নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। জোসেফ লসমিডট পরীক্ষামূলকভাবে এই সংখ্যা নির্ণয় করেন, যার মান ছিল ৭২ x ১০^২৩। বিংশ শতাব্দীতে ব্রাউনীয় গতি আবিষ্কারের পর পেরিন ধ্রুবকটির মান পুনর্নির্ধারণ করেন এবং পান ৬.৭ x ১০^২৩। এরপর মিলিকনের তৈলবিন্দু পদ্ধতিতে মান দাঁড়ায় ৬.০৬৪ x ১০^২৩। তবে কোনো পদ্ধতিতেই সঠিক মান পাওয়া যাচ্ছিল না। অবশেষে পরমাণুর কেলাসের গঠন আবিষ্কারের পর ধ্রুবকটির নিখুঁত মান নির্ণয় সম্ভব হয় — ৬.০২২১৩৩৫ x ১০^২৩, যা বর্তমানে রাসায়নিক সমীকরণে ব্যবহৃত হয়।
এই ধ্রুবকের বিশেষত্ব হলো এর কোনো একক নেই; এটি শুধু একটি সংখ্যা, যা বিজ্ঞানে বিরল। সংখ্যাটি কত বিশাল তা বোঝাতে বলা হয়, ৮৬ ট্রিলিয়ন পৃথিবীর জনসংখ্যা একত্র করলে তা অ্যাভোগেড্রো সংখ্যার সমান হবে। এই আবিষ্কার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণার সূচনা করে — প্রতিটি মৌলের পারমাণবিক ভর বা যৌগের আণবিক ভর গ্রামে প্রকাশ করলে তাতে অ্যাভোগেড্রো সংখ্যার সমান অণু বা পরমাণু থাকে। এ থেকেই মোলের ধারণার জন্ম। অ্যাভোগেড্রোর সম্মানে প্রতিবছর ২৩ অক্টোবর সকাল ৬টা ২ মিনিট থেকে সন্ধ্যা ৬টা ২ মিনিট পর্যন্ত সময় 'মোল দিবস' হিসেবে পালন করা হয়।




