বিমা খাতে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা গ্রাহকের দাবি পরিশোধে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন। বর্তমানে জীবন ও সাধারণ বিমা মিলিয়ে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকার দাবি বকেয়া রয়েছে, যার মধ্যে মাত্র সাতটি কোম্পানির কাছেই প্রায় চার হাজার কোটি টাকার দাবি আটকে আছে বলে জানান তিনি। বৃহস্পতিবার আইডিআরএ কার্যালয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এ কথা বলেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, বিমা খাতে সবচেয়ে বড় সংকট গ্রাহকের আস্থা। সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে প্রথম কাজ হবে বকেয়া দাবি পরিশোধ। দাবি পরিশোধ শুরু হলে ধীরে ধীরে গ্রাহকের আস্থা ফিরে আসবে, যা পুরো খাতকে স্থিতিশীল করতে সহায়তা করবে। গত দুই সপ্তাহে সবচেয়ে সংকটে থাকা সাতটি বিমা কোম্পানির মালিক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের (সিইও) সঙ্গে বৈঠক করেছেন আইডিআরএ চেয়ারম্যান। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্পদ, বিনিয়োগ ও আর্থিক সক্ষমতা পর্যালোচনা করা হয়েছে। কোথাও সম্পদের মূল্য নিয়ে সন্দেহ থাকলে নতুন করে মূল্যায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চেয়ারম্যান জানান, এসব কোম্পানির জমি, সরকারি ট্রেজারি বন্ড, বিনিয়োগসহ বিভিন্ন সম্পদ ধাপে ধাপে বিক্রি করা হবে। সেই অর্থ প্রতিটি কোম্পানির নামে আলাদা ব্যাংক হিসাবে জমা থাকবে, যেখানে নিরীক্ষকের তদারকি থাকবে। এরপর ‘ফার্স্ট ইন, ফার্স্ট আউট (এফআইএফও)’ পদ্ধতিতে আগে জমা পড়া দাবিগুলো আগে পরিশোধ করা হবে। বকেয়া দাবি পরিশোধে কোম্পানির সম্পদ নগদায়নের জন্য চারটি উৎস বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে: ভালো ব্যাংকে থাকা স্থায়ী আমানত (এফডিআর), সরকারি ট্রেজারি বন্ড, বিক্রিযোগ্য জমি এবং অন্যান্য বিনিয়োগ। ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকে আটকে থাকা আমানতের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধান খোঁজা হবে বলেও জানান তিনি।
কমিশন বাণিজ্য ও অনিয়ম প্রসঙ্গে মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, বিমা খাতে অতিরিক্ত কমিশন দেওয়ার প্রবণতা এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে বেতন বা বিভিন্ন চুক্তির আড়ালে কমিশন দেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের গোপন কমিশনের প্রমাণ সংগ্রহ ও নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে আইডিআরএ। আগামী এক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার আশা প্রকাশ করেন তিনি।
আইডিআরএ চেয়ারম্যান আরও জানান, বিমা খাতে প্রচলিত কমপ্লায়েন্সভিত্তিক তদারকির পরিবর্তে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি (রিস্ক বেজড সুপারভিশন) চালু করা হবে। বর্তমানে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে যে আর্থিক প্রতিবেদন আসে, সেগুলো অনেক সময় পুরোনো হওয়ায় প্রকৃত ঝুঁকি বোঝা যায় না। নতুন ব্যবস্থায় নিয়মিত ও হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থার মূল্যায়ন করা হবে।
গ্রাহক সুরক্ষায় ইউনিক পলিসি হোল্ডার আইডি বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগের কথাও জানান চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, প্রতিটি বৈধ বিমা পলিসির বিপরীতে গ্রাহকের মোবাইলে একটি ইউনিক আইডি যাবে। ভবিষ্যতে ওই আইডি না পেলে গ্রাহকদের ওই পলিসিতে প্রিমিয়াম না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে দেশব্যাপী সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হবে। বিমা কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তাদের শিক্ষাগত সনদ জালিয়াতির অভিযোগের বিষয়ে ভবিষ্যতে সনদ যাচাই আরও কঠোর করা হবে বলেও জানান তিনি।
দুর্বল বিমা কোম্পানির পরিচালকদের ব্যক্তিগত অর্থ থেকে জরিমানা আদায়ের সুযোগ আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে চেয়ারম্যান বলেন, বিদ্যমান আইনে সেই সুযোগ নেই, তবে বিষয়টি নীতিগতভাবে আলোচনা হচ্ছে। বিমা কোম্পানির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, খাতটিতে বহুস্তরীয় সমস্যা রয়েছে, তাই সব বিষয়ে একসঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়। প্রথম ধাপে গ্রাহকের দাবি পরিশোধ ও খাতকে স্থিতিশীল করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এরপর যেসব ক্ষেত্রে অর্থ আত্মসাৎ বা অন্য অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেগুলোর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং আত্মসাৎ হওয়া অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আইডিআরএ চেয়ারম্যান আরও বলেন, সংস্থাটিতে জনবলসংকটও বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারি নিয়োগে সীমাবদ্ধতা থাকায় বিকল্প উপায়ে মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন ও তদারকি জোরদারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তিনি শেষে বলেন, বিমা খাতকে সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনতে সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিমা কোম্পানি এবং গণমাধ্যমসহ সব পক্ষের সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন।



