বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক, সমালোচনা ও আর্থিক অনিয়মের বোঝা আর বইতে চাইছে না বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক এই টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টের আয়োজন থেকে পুরোপুরি সরে আসার কথা বিবেচনা করছে তামিম ইকবালের নেতৃত্বাধীন বর্তমান বোর্ড। প্রথম আলোর কাছে বিসিবির একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, সমস্যাসংকুল এই লিগ আর না করার বিষয়ে পরিচালকদের অধিকাংশই একমত।

তাদের বক্তব্য, অপেশাদার ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকদের কারণে দেশের ক্রিকেট আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দুর্নাম কুড়াচ্ছে এবং বোর্ডের ওপর অহেতুক আর্থিক চাপ তৈরি করছে। বোর্ড সূত্রে জানা গিয়েছে, ভবিষ্যতে যদি ট্রুনামেন্টটি হয়ও, তার আগে পুরোপুরি বিতর্কমুক্ত করতে চায় বোর্ড। অতীতের সব অভিযোগের সমাধান না হলে আগামী ডিসেম্বরে নির্ধারিত আসরটি নাও হতে পারে।

প্রতি মৌসুমেই বিপিএল ঘিরে স্পট ফিক্সিংয়ের অভিযোগ, দেশি-বিদেশি খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক বকেয়া, ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর সঙ্গে বিসিবির দ্বন্দ্ব, প্রতিষ্ঠিত গুণগত প্রতিষ্ঠানের ফ্র্যাঞ্চাইজি না হওয়া এবং অপরেশাদার আচরণের অভিযোগ নতুন নয়। ক্রিকেট বিশ্বে এই টুর্নামেন্ট 'সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট' হিসেবেও চিহ্নিত হয়েছে। ২০২৪ সালের আসরে স্পট ফিক্সিংয়ের অভিযোগ তদন্তে সাবেক বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দারের নেতৃত্বাধীন কমিটি প্রতিবেদনে কিছু সমস্যা চিহ্নিত করে পরবর্তী আসরের আগে সমাধানের সুপারিশ করলেও, তা অগ্রাহ করেই শেষ মৌসুমের আয়োজন হয়। এমনকি সেই তদন্ত প্রতিবেদন এখনও প্রকাশিত হয়নি।

এই প্রেক্ষাপটে বোর্ডের ভিতরে বিকল্প দুইটি চিন্তা বিদ্যমান। প্রথমটি হলো, এবছর বিপিএল বাতিল বা স্থগিত করে শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত ফ্র্যাঞ্চাইজিদের নিয়ে ভবিষ্যতে নতুন করে যাত্রা শুরু করা। খেলোয়াড়রা যাতে আর্থিকভাবে মারাত্মক ধাক্কা না খায়, সেজন্য বিপিএলের নির্ধারিত সময়ে এনসিএল টি-টোয়েন্টি কিংবা অন্য কোনো ঘরোয়া আসর আয়োজন করার পরিকল্পনাও আছে। দ্বিতীয়ত, 'বিপিএল' নামটিরই যেহেতু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে, তাই এই নাম পুরোপুরি পরিত্যাগ করে সম্পূর্ণ নতুন নামে ও পরিকল্পনায় একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ শুরু করার পক্ষপাতেও মত আছে। সেক্ষেত্রে আসন্ন মৌসুমে কোনো টুর্নামেন্ট হবে না, বরং যথেষ্ট সময় নিয়ে গোছগাছে ব্যবস্থা নেবে বিসিবি। আজ (মঙ্গলবার) বিসিবির টুর্নামেন্ট কমিটির সমন্বয় সভায় এ বিষয়ে আলোচনার কথা রয়েছে।

বিপিএল-এর ক্ষতি ও সুবিধাহীনতার চিত্র তুলে ধরে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পরিচালক বলেন, 'অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে এক-দুটি দলের প্রায় সমস্ত খেলোয়াড়ের পারিশ্রমিক বিসিবিকে পরিশোধ করতে হয়। ফ্র্যাঞ্চাইজিরা ইচ্ছামত দাম হাঁকে, কিন্তু পরে আর দেয় না। এইসব দায় বোর্ডের ঘাড়ে চাপিয়ে তারা পালায়। তাছাড়া টিভি স্বত্ত্ব বিক্রির প্রাপ্ত অর্থের সিংহভাগই প্রোডাকশন খরচে বিলীন হয়। সব মিলিয়ে এই বিপিএল আয়োজনের ইতিবাচক কী আছে?'

অপরদিকে, বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ফাহিম সিনহা এখনও আয়োজন আয়োজন নিয়ে আশা প্রকাশ করলেও শর্তসাপেক্ষ মনোভাবের আভাস দিয়েছেন। তার ভাষ্য, 'ভালো ফ্র্যাঞ্চাইজি নিয়ে ট্রুনামেন্ট করার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাব। যদি সেটা সম্ভব না হয়, তবে হয়তো এক সিজন বিরতি নিতে হবে।' পাশাপাশি তিনি জানান, কিছু সুপরিচিত প্রতিষ্ঠান এবার দল নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে, তিনি ভবিষ্যতে লিগের নাম পরিবর্তনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছেন।